স্টাফ রিপোর্টার : প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সাদা কাগজে দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে ৬১ গ্রাহকের কাছ থেকে ৯১ লক্ষ ৫৫ হাজার টাকা আত্নসাতের ঘটনায় রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র সহ ৭ জনের বিরুদ্ধে দুর্ণীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের হয়েছে। গত রবিবার (২ আগস্ট) রাজবাড়ীর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে মামলাটি দায়ের করেন, কুষ্টিয়া বিভাগের পোস্ট অফিস পরিদর্শক (প্রশাসন) মোঃ শহিদুল ইসলাম। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র, রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা, শিহাবের ভাই পিএলআই এজেন্ট মাহবুব হাসান মৃধা, প্রধান ডাকঘরের অফিস সহায়ক রেজাউল আলম, তৎকালীন ট্রেজারার নাজমুল হাসান, পোষ্টাল অপারেটর মোঃ গোলাম মোস্তফা বাচ্চু, পোষ্টাল অপারেটর প্রনব কুমার সরকার। রাজবাড়ীর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোঃ আনিসুর রহমান মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়,ফরিদপুরে এফআই’র হিসেবে রুজু করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদককে নির্দেশ দিয়েছেন।
অভিযোগে প্রকাশ, অভিযুক্তরা যোগসাজসে দুর্ণীতির আশ্রয় নিয়ে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬১জন গ্রাহকের ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের আমানত ৯১ লক্ষ ৫৫ হাজার টাকা আত্নসাৎ করেন। শিহাব মৃধার মাতা শিউলী বেগম গত ৩০ জুলাই তারিখের মধ্যে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার অঙ্গিকারনামা প্রদান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ফেরত দিতে অস্বীকার করেন।
রাজবাড়ী বারের আইনজীবি এ্যাড. বিজন কুমার ঘোষ বলেন, মামলাটি বিচারক গ্রহণ করেছেন। আদেশ পরবর্তীতে প্রদান করবেন।
এরআগে গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ভূক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষে নাছরিন আক্তার বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলে রাজবাড়ী অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর আমলী আদালতের বিচারক মোঃ হায়দার আলী অভিযুক্ত সকলের বিরুদ্ধে সমন ইস্যুর আদেশ দেন।
অভিযোগে প্রকাশ, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় লেটার রাইটার শিহাব মৃধা পোস্ট অফিসে আগত গ্রাহকদের সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে বিভিন্ন সময়ে সাদা স্লিপের মাধ্যমে ৬১ জন গ্রাহকের কাছ থেকে কোটি টাকা নিয়ে সরকারী কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করে। মামলায় অভিযুক্ত আসামীরা হলো, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র, লেটার রাইটার শিহাব মৃধা, পিএলআই এজেন্ট মাহবুব মৃধা, লেটার রাইটার মাহবুবুর রহমান, পোষ্টাল অপারেটর নাজমুল হাছান, ট্রেজারার পবিত্র কুমার সরকার, এম.এল.এস.এস মোঃ রেজাউল আলম, পোষ্টাল অপারেটর মোঃ গোলাম মোস্তফা বাচ্চু, পোষ্টাল অপারেটর এস এম নুরুজ্জামান, পোষ্টাল অপারেটর আসমা আক্তার, প্যাকার কাম মেইল ক্যারিয়ার বিউটি রানী দাস, পোষ্টাল কর্মচারী নুরুল মাসুদ ও রোকসানা আক্তার। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে সকলের বিরুদ্ধে সমন ইস্যুর আদেশ দেন। বাদী পক্ষে আইনজীবী ছিলেন এ্যাড. অশোক কুমার ঘোষ-২, এ্যাড. নজরুল ইসলাম লাভলু ও এ্যাড. খান মোঃ জহুরুল হক।
জানা গেছে, গত ১২ জুলাই কুষ্টিয়া বিভাগীয় ডাক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা তদন্তে এসে ঘটনার মূল হোতা লেটার রাইডার শিহাবকে ডাকঘরে পেলেও তাকে পুলিশে সোপর্দ না করে ছেড়ে দেন। এরপর থেকেই তিনি পলাতক। তার বাড়িতে খোঁজ নিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা ডাকঘরে এসে তাদের অর্থ ফেরতের দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা মূল শেল্টার দাতা পোস্ট মাস্টার বিকাশ বিশ্বাসকে সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় বদলী করা হয়েছে।
এদিকে গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদের স্বাক্ষরিত এক পত্রে ঘটনাটি তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটিতে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পোস্ট মাস্টার জেনারেলকে সভাপতি, খুলনা সার্কেল অফিসের সুপারিন্টেন্ডেন্টকে (তদন্ত) সদস্য সচিব, ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেল (তদন্ত), দক্ষিণাঞ্চল, খুলনা ও কুষ্টিয়া বিভাগের ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেলকে সদস্য করা হয়েছে।
কমিটিকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিধি-বিধানের অপর্যাপ্ততা বা পদ্ধতিগত কোনো ত্রুটির কারণে সরকারি ক্ষতি সংঘটিত হয়ে থাকলে তা সংশোধন, নিরসন ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষে যুক্তিসংগত প্রস্তাব বা সুপারিশসমূহ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের নবাগত পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ বলেন, ২০২১ সাল থেকে শিহাব মৃধা হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে লেটার রাইটারের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি সরকারি কর্মচারী নন। ডাক অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী এ ধরনের কর্মী বিভিন্ন ডাকঘরে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদি সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে তিনি প্রায় অর্ধশত গ্রাহকের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্রের বই না পাওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
তিনি আরও বলেন, আমি গত ৬ জুলাই রাজবাড়ী ডাকঘরে যোগদান করেছি। যোগদানের পর বিষয়টি জানতে পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। তাদের পরামর্শে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ মামলা করার পরামর্শ দেয়। পরে বিষয়টি কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয় এবং সেখান থেকে খুলনা সার্কেল অফিসে জানানো হয়। বর্তমানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : খান মোহাম্মদ জহুরুল হক
কার্যালয় : রাজবাড়ী প্রেসক্লাব ভবন, কক্ষ নং : ৩ (নীচতলা),
প্রধান সড়ক, রাজবাড়ী।
ফোন : ০১৭১১-১৫৪৩৯৬, ০১৯৭১১-৫৪৩৯৬
ই-মেইল : rajbariprotidin409@gmail.com
স্বত্ব © ২০২৬ রাজবাড়ী প্রতিদিন