স্টাফ রিপোর্টার : রেলওয়েতে ট্রেন মেরামতের ব্যবস্থা অপ্রতুল। সামনের দিনগুলোতে নতুন নতুন ট্রেন এলে মেরামতের সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট হবে। এজন্য ২০১৮ সালে রাজবাড়ীতে রেলওয়ের নতুন ক্যারেজ-ওয়াগন কারখানা স্থাপনের প্রকল্প নেওয়া হয়; কিন্তু তেমন গুরুত্ব পায়নি। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে প্রকল্পটি স্থগিত করা হয় অন্তর্বতী সরকারের আমলে। সে সময় বলা হয়, সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমের বাড়ি রাজবাড়ী। তাই এটি রাজনৈতিক প্রকল্প। আসলে প্রকল্পটি গ্রহণকালে রেলমন্ত্রী ছিলেন মুজিবুল হক। এখন ভালো খবর হচ্ছে, রেলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী বর্তমান সরকার।
জানা গেছে, রেলওয়ের ক্রমবর্ধমান রোলিং স্টকের রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে রাজবাড়ীতে আধুনিক ক্যারেজ ও ওয়াগন মেরামত কারখানাটি নির্মাণের উদ্যোগ গতি পেয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন হওয়া এবং বৈদেশিক অর্থায়নকারী সংস্থা নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি পুনরায় প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটির পিডিপিপি (প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) নীতিগতভাবে অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরিকল্পনা কমিশনকে অনুরোধ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন রেল চলাচল, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলায় প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী।
এ বিষয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, রাজবাড়ীতে একটি ক্যারেজ ওয়ার্কশপ করা হবে। এজন্য প্রস্তাবটি রেল মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এনডিবি আগ্রহ দেখিয়েছে। পিডিপিপির পর ইআরডি তাদের সঙ্গে বৈদেশিক অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা করতে পারে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রেলবহরে ১ হাজার ৯০৩টি ক্যারেজ ও ৩ হাজার ৩৭৫টি ওয়াগন রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে আরও ২০০টি ব্রডগেজ কোচ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে যাত্রীবাহী কোচের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২ হাজার ১০৩টি। বর্তমানে যাত্রীবাহী কোচ ও মালবাহী ওয়াগন মেরামতের জন্য রেলের প্রধান দুটি কারখানা হলো সৈয়দপুর ও পাহাড়তলী। পশ্চিমাঞ্চলের ব্রডগেজ ও মিটারগেজ ক্যারেজ-ওয়াগনের রক্ষণাবেক্ষণের বড় অংশ সৈয়দপুর কারখানায় হয়। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলের মিটারগেজ কোচ ও ওয়াগনের রক্ষণাবেক্ষণ প্রধানত পাহাড়তলী কারখানায় সম্পন্ন করা হয়।
রেলওয়ের নথিতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান দুটি কারখানা আধুনিকায়ন করার প্রক্রিয়া চলমান। তবে ভবিষ্যৎ চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা যথেষ্ট হবে না। প্রস্তাবিত আধুনিকায়নের পর সৈয়দপুর কারখানায় বছরে ১ হাজার কোচ ও ২ হাজার ওয়াগন এবং পাহাড়তলী কারখানায় একই পরিমাণ কোচ ও ওয়াগন মেরামতের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে; কিন্তু রেলওয়ের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, ২০৪৫ সালে রেলবহরে যাত্রীবাহী কোচের সংখ্যা ৪ হাজার ৪৪৭ এবং মালবাহী ওয়াগনের সংখ্যা ৫ হাজার ২৫৪টিতে পৌঁছানোর কথা। ফলে শুধু বিদ্যমান দুটি কারখানার ওপর নির্ভর করলে বিপুলসংখ্যক কোচ ও ওয়াগনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হবে না।
রেলওয়ের হিসাবে সে সময় প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার ৪৪৭টি কোচ এবং ১ হাজার ২৫৪টি ওয়াগন প্রয়োজনীয় মেরামত সুবিধার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের বাইরে থাকা রোলিং স্টক নিরাপদ ট্রেন পরিচালনার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রাজবাড়ীতে প্রস্তাবিত কারখানার জন্য মোট ১০৫ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রেলওয়ের নিজস্ব অব্যবহৃত জমি রয়েছে ৩৫ একর। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এ জমি উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পিত কারখানায় যাত্রীবাহী কোচ ও মালবাহী ওয়াগনের আধুনিক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে মেরামতের অপেক্ষায় থাকা রোলিং স্টকের সংখ্যা কমানো, রেলের পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় মনে করছে, নতুন কারখানা চালু হলে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে রেলওয়ের ওপর বাড়তে থাকা রক্ষণাবেক্ষণের চাপও কমবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিশদ নকশা, পিডিপিপি এবং দরপত্র দলিল তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পটি শূন্য থেকে শুরু করার প্রয়োজন নেই; অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার মতো প্রস্তুতি রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহসংক্রান্ত এক পর্যালোচনা সভায় প্রকল্পটির পিডিপিপি অনুমোদনের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময় প্রকল্পটির সম্ভাব্য অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তাই স্থগিতের অন্যতম কারণ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে প্রতীয়মান হয়।
স্থগিত প্রকল্পটি আবারও সামনে আসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে বৈদেশিক অর্থায়নের সম্ভাবনা। গত ১৪ জুলাই রেলপথ মন্ত্রণালয় ও নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এনডিবি প্রকল্পটিতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ১৬ জুলাই এ বিষয়ে এনডিবির অর্থায়নসংক্রান্ত সম্মতিপত্রও পাওয়া যায়।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নথিতে বলা হয়েছে, পিডিপিপি নীতিগতভাবে অনুমোদিত হলে বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহসহ পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর আগে ২০২৪ সালে প্রকল্পটির জন্য জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ডিসেম্বর ২০৩১ মেয়াদে মোট ৭ হাজার ৬৮৩ কোটি ১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল। তবে প্রকল্পটি পুনরায় প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে এই ব্যয় ও মেয়াদ পরিবর্তিত হতে পারে কিনা, তা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত হবে।
রাজবাড়ীতে কারখানা স্থাপনের অন্যতম যুক্তি হলো রেলের নিজস্ব জমির ব্যবহার এবং দেশের রেল নেটওয়ার্কের পশ্চিমাঞ্চলে রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা আরও বিস্তৃত করা। বর্তমানে বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সৈয়দপুরের ওপর পশ্চিমাঞ্চলের রোলিং স্টকের উল্লেখযোগ্য চাপ রয়েছে। নতুন একটি কারখানা যুক্ত হলে শুধু মেরামতের সক্ষমতা বাড়বে না, বরং বিভিন্ন অঞ্চলের রোলিং স্টকের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের চাপও ভাগ করা সম্ভব হবে। এতে মেরামতের অপেক্ষায় কোচ ও ওয়াগন পড়ে থাকার সময় কমতে পারে।
রেলওয়ের ভাষ্য, রেলওয়ের জন্য নতুন কারখানাটিকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এটি রেল পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়মিত পরিদর্শন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সরাসরি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। রেলবহর যত বড় হবে, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা সমানতালে না বাড়লে মেরামতের ব্যাকলগও তত বাড়বে। ফলে নতুন কারখানা নির্মাণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ রোলিং স্টকের জন্য আগাম রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা তৈরি করাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সুত্র: আমাদের সময়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : খান মোহাম্মদ জহুরুল হক
কার্যালয় : রাজবাড়ী প্রেসক্লাব ভবন, কক্ষ নং : ৩ (নীচতলা),
প্রধান সড়ক, রাজবাড়ী।
ফোন : ০১৭১১-১৫৪৩৯৬, ০১৯৭১১-৫৪৩৯৬
ই-মেইল : rajbariprotidin409@gmail.com
স্বত্ব © ২০২৬ রাজবাড়ী প্রতিদিন