স্টাফ রিপোর্টার : রাজবাড়ী জেলার একমাত্র সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার জনবল সংকটে বেহাল দশার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে খামারের ভবন, শেড ও বিভিন্ন অবকাঠামো। তার উপর ১৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র চারজন। ২০১৪ সাল থেকে শূন্য ব্যবস্থাপকের পদেও চলছে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে কাজ। ফলে একদিকে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম, অন্যদিকে সরকারি অর্থে গড়ে ওঠা কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাচ্চা লালন-পালন করে বিক্রি কার্যক্রম চালু রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
খামার সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ী শহরের নতুন বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকার ভবানীপুর গ্রামে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে প্রায় ২ দশমিক ৮৮ একর জমির ওপর ১৯৮১-৮২ সালে খামারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে। শুরুতে সরকারি হাঁস-মুরগির খামার হিসেবে হ্যাচারি কার্যক্রমসহ এর যাত্রা শুরু হলেও ১৯৯৭ সালে হ্যাচারি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে সরকারি আদেশে এর নাম পরিবর্তন করে ‘সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার’ করা হয়। কিন্তু নামের সঙ্গে ‘প্রজনন’ থাকলেও বর্তমানে এখানে মুরগি প্রজনন হচ্ছে না।
খামারটিতে ব্যবস্থাপকসহ মোট ১৪টি পদ রয়েছে। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। ২০১৪ সাল থেকে ব্যবস্থাপকের পদটি শূন্য থাকায় পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট অফিসার মোঃ মেহেদী হাসান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করছেন। অফিস সহকারী, পোলট্রি টেকনিশিয়ান ও নিরাপত্তা প্রহরীর পাঁচটি পদের বিপরীতে রয়েছেন তিনজন। এ ছাড়া ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট, ড্রাইভার, ইলেকট্রিশিয়ান, পোলট্রি অ্যাটেনডেন্ট, হ্যাচারি অ্যাটেনডেন্ট, অফিস সহায়ক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদগুলোও শূন্য রয়েছে।
ফলে অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীকেই একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা, বাচ্চা লালন-পালন এবং খামারিদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের মধ্যেও খামারটি পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে একদিনের বাচ্চা এনে লালন-পালন করে বিক্রি করছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২০ হাজার বাচ্চা লালন-পালন করে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে ১৮ হাজার ৭০টি বাচ্চা বিক্রি হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯০ শতাংশ। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০ হাজার ১৫০টি বাচ্চা লালন-পালন করে বিক্রির মাধ্যমে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪ হাজার ২০০টি বাচ্চা বিক্রি হয়েছিল, যা ছিল লক্ষ্যমাত্রার ৭১ শতাংশ।
বর্তমানে খামারে বাচ্চা পালনের জন্য চারটি শেড রয়েছে। এর মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে এক দিনের বাচ্চা এনে এখানে লালন-পালন করা হয়। পরে এক থেকে দেড় মাস বয়সে খামারিদের কাছে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে চার ডোজ ভ্যাকসিন সম্পন্ন এক মাস বয়সী বাচ্চা ৮০ টাকা এবং ৪২ দিন বয়সী বাচ্চা ১০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খামারের বিভিন্ন স্থাপনা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ব্যবস্থাপকের বাসভবন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আবাসিক ভবন এবং বিক্রয়কেন্দ্র পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বিভিন্ন ভবন ও শেডের দেয়াল-ছাদে ক্ষয় দেখা দিয়েছে। কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা, কোথাও গজিয়েছে ঝোপঝাড়। এ ছাড়া পানির পাম্প, জেনারেটর, গাড়িসহ বিভিন্ন সরঞ্জামও দীর্ঘদিনের অব্যবহারে নষ্ট হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অবকাঠামো ও সরঞ্জাম সচল করা গেলে খামারের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় রজব আলী মোল্লা বলেন, সরকারি এই খামারটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে আছে। দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হলে এলাকার মানুষ ও খামারিরা উপকৃত হবেন।
জালাল মন্ডল বলেন, খামারটির কার্যক্রম বাড়ানো হলে স্থানীয় খামারিরা কম দামে উন্নত জাতের মুরগির বাচ্চা পাবেন। এতে এলাকার পোলট্রি খাতও আরও এগিয়ে যাবে।
রবিউল ইসলাম বলেন, পুরোনো ভবন ও অবকাঠামোগুলো দ্রুত সংস্কার করা দরকার। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া হলে সরকারি সম্পদের অপচয় রোধের পাশাপাশি খামারটির কার্যক্রমও গতিশীল হবে।
রাজবাড়ী জেলা এনজিও ফেডারেশনের সভাপতি লুৎফর রহমান লাবু বলেন, সরকারি এই খামারটি শুধু অবকাঠামোর দিক থেকে নয়, কার্যক্রমের দিক থেকেও পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। আধুনিকায়ন ও পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা গেলে এটি এলাকার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
খামারের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক মোঃ মেহেদী হাসান বলেন, ১৪টি পদের বিপরীতে মাত্র চারজন কর্মরত থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এরপরও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, চারটি শেডের মধ্যে তিনটি সচল রয়েছে। অপর শেড ও আবাসিক ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এগুলো সংস্কার এবং শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগ করা হলে উৎপাদন ও সেবার মান আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বাচ্চা লালন-পালন করে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে বলেও জানান।
রাজবাড়ী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে খামারটির বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে অবকাঠামোগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। মাঝেমধ্যে সামান্য বাজেট আসে। তা দিয়ে গত বছর একটি শেড মেরামত করে বাচ্চা লালন-পালনের উপযোগী করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার হলেও বর্তমানে এখানে মুরগি প্রজনন হয় না। বৃহত্তর ফরিদপুর বা কুষ্টিয়া থেকে এক দিনের বাচ্চা এনে লালন-পালন করে সরকারি মূল্যে বিক্রি করা হয়। খামারটিকে আধুনিক প্রজনন খামার বা হ্যাচারিতে রূপান্তর করা গেলে ডিম থেকে বিপুলসংখ্যক বাচ্চা উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে ডিম ও মাংসের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের চাহিদাও পূরণ হবে।
তিনি আরও বলেন, ১৪ জনের জায়গায় মাত্র চারজন দিয়ে কাজ চালাতে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। খামারের উন্নয়নে কীভাবে কাজ করা যায়, সে বিষয়ে প্রস্তাব পাঠানোর জন্য সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : খান মোহাম্মদ জহুরুল হক
কার্যালয় : রাজবাড়ী প্রেসক্লাব ভবন, কক্ষ নং : ৩ (নীচতলা),
প্রধান সড়ক, রাজবাড়ী।
ফোন : ০১৭১১-১৫৪৩৯৬, ০১৯৭১১-৫৪৩৯৬
ই-মেইল : rajbariprotidin409@gmail.com
স্বত্ব © ২০২৬ রাজবাড়ী প্রতিদিন