জেলেদের জালে মিলছে না ইলিশ : রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে ১০ বছরে ইলিশের উৎপাদন সরকারী হিসেবে বাড়ছে

লেখক:
প্রকাশ: ২ দিন আগে

সোহেল রানা : ইলিশ মাছ উৎপাদনে বিখ্যাত এলাকার মধ্যে একটি জেলা রাজবাড়ী। এ জেলার ৫ উপজেলার মধ্যে ৪ টি পদ্মা ও ৩টি গড়াই নদী বিধৌত। রাজবাড়ীর রুপালী ইলিশের সুখ্যাতি রয়েছে দীর্ঘকাল ধরেই। পদ্মা নদীর পাশাপাশি গড়াই নদীতেও মিলতো প্রচুর ইলিশ। কিন্তু দিন দিন রাজবাড়ীতে ইলিশের উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। সরকারী ভাবে ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করলেও উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় জেলেদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। প্রজনন মৌসুম সহ মাঝে মধ্যেই পদ্মায় জেলেদের জালে ধরা পড়ে রুপালী ইলিশ। কিন্তু বছরের অন্য সময়ে পদ্মায় ইলিশ ধরা না পড়ায় হতাশ রাজবাড়ীর জেলে ও ব্যবসায়ীরা। সরকারী হিসেবে ইলিশের উৎপাদন বাড়লেও জেলেদের জালে মিলছে না ইলিশ।
জেলা মৎস্য দপ্তর তথ্যমতে, রাজবাড়ী পদ্মা নদীতে ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ১৯৩ মেট্রিকটন, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৩৮২ মেট্রিক টন, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৮০৯ মেট্রিকটন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮১২ মেট্রিকটন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮৩০ মেট্রিকটন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮৩৬ মেট্রিকটন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮১১ মেট্রিকটন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮১৮ মেট্রিকটন, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ৭৩৭ মেট্রিকটন, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৮৭৮ মেট্রিকটন উৎপাদন হয়েছে। জেলার রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দে সবচেয়ে বেশি ইলিশ উৎপাদন হয়। জেলায় ৫ হাজার জেলে ইলিশ মাছ ধরার সাথে জড়িত। গড়াই নদীতেও ইলিশ উৎপাদন হয়।
স্থানীয় আলমগীর হোসেন, সঞ্জয় বিশ^াস, আলেক বলেন, পদ্মার ইলিশ অনেক কম দামে পেতেন। পদ্মার ইলিশ না পাওয়ায় বেশি দামে ইলিশ কিনতে হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যায়ের মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে ইলিশ। ইলিশ কি পাচার হয়, না সত্যিই নদীতে ধরা পড়ছে না। ইলিশ না পাওয়া গেলে কারণ চিহিৃত করে রাজবাড়ীর পদ্মায় ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে হবে।
জেলে অমল, সুজয়, কৃষ্ণ সহ অনেকে বলেন, পদ্মায় মাছ ধরে তারা জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। বিগত বছর গুলোতে প্রচুর ইলিশ মাছ পেলেও গত ৩-৪ বছর ধরে নদীতে ইলিশ মিলছে না। চাঁদপুর অঞ্চলে অধিকহারে ইলিশ আহরণ, নদীর গভীরতা ও স্রোত কম থাকা সহ বিভিন্ন কারণে রাজবাড়ীর পদ্মায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না । মৌসুমের সময় ইলিশ পাওয়া গেলেও নিষেধাজ্ঞা থাকায় নদীতে নামতে পারেন না। কাঙ্খিত ইলিশ না পাওয়ায় রুই, কাতলা, পাঙ্গাস, বোয়ালসহ নদীর ছোট মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করেন।
পদ্মা তীরবর্তী উড়াকান্দা বাজারের মৎস্য আড়তদার আলমগীর শেখ বলেন, পদ্মায় কোন ইলিশ মাছ এখন বেশি মেলে না। মাছ ধরা পড়লে তাদের আড়তে আসতো। প্রতিদিন এক থেকে দুই লক্ষ টাকার নদীর বিভিন্ন ধরনের মাছ তার আড়তে বেচাকেনা হয়। মাঝে মাঝে ২-৪টি ইলিশ মাছ মেলে।
রাজবাড়ী মাছ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফয়েজ উদ্দিন ফকির বলেন, পদ্মার ইলিশ খুবই সুস্বাধু। রাজবাড়ী পদ্মার ইলিশ তারা এখন পান না। তারা বরিশাল, ভোলা, মহিপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, পাথরঘাটা সহ বিভিন্ন স্থানের ইলিশ মাছ বিক্রি করেন। এ কারণে দামও বেশি পড়ছে। রাজবাড়ীর পদ্মার ইলিশ পেলে দামও একটু কম হতো। চাহিদা অনুযায়ী তারা মাছ পান না।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মাহবুব উল হক বলছেন, পদ্মা খরস্রোতা নদী হওয়ায় রাজবাড়ীর অংশ সহ উজানে মাত্রাতিরিক্ত পলি পড়ে অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি, দখল-দূষণসহ নানা কারণে ইলিশের অবাধ বিচরণ বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। এ কারণে দিন দিন রাজবাড়ীতে কমছে ইলিশের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। নদী হারিয়েছে তার চিরচেনা রূপ। এসব বাঁধা পেরিয়ে রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে আসছে না তেমন ইলিশ। এ কারণে রাজবাড়ীর পদ্মায় মিলছে না ইলিশ, ফলে জেলাবাসীকে বেশি দাম দিয়ে কিনে খেতে হয় অন্য জেলার ইলিশ।
তিনি বলেন, ডুবোচর খনন করে ইলিশের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করা গেলে পদ্মায় ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে। তারপরও পদ্মায় ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা সংরক্ষণ সহ সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী নদীতে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জেলের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছেন। ইলিশের সাথে সর্ম্পৃক্ত জেলার প্রায় ৫ হাজার জেলেকে নিয়মিত সরকারী সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে, এ বছর ইলিশের উৎপাদন গত বছরের চেয়ে হ্রাস পাবে।