সিরাজুল ইসলাম : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া এলাকায় পদ্মা ও যমুনা নদীতে চলাচলকারী বাল্কহেড থেকে ‘চ্যানেল চার্জের’ নামে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় যে সমস্ত নৌকা মালামাল আনলোড করে সেখানেও গুনতে হয় টাকা।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি বাল্কহেড থেকে দৈনিক ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা আদায় হচ্ছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীরা। ইজারার শর্ত অনুযায়ী ঘনফুট অনুযায়ী টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও টাকা নেওয়া হচ্ছে গড় হারে। এ জন্য নদীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একটা বিশেষ বাহিনীকে। যারা দিনরাত নদীতে অবস্থান করে। এখানে ঘনফুট বা নৌকার আকৃতি নয় টাকা নেওয়া হচ্ছে মন মর্জি। সাবেক সর্বহারার নেতা বাকেনের নেতৃত্বে তোলা হয় টাকা। এ টাকা না দিলেই নেমে আসে নির্যাতন। তাছাড়া পদ্মায় রয়েছে লাল পতাকা বাহিনী তাদেরকে দিতে হয় নির্দিষ্ট অংকের টাকা।
সরেজমিনে পদ্মা ও যমুনা নদী এলাকা ঘুরে এবং ভুক্তভোগী নৌ-যানচালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীপথে চলাচলকারী বাল্কহেড থেকে স্পিডবোটের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করা হয়। টাকা আদায়ের পর দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন আদায়কারীরা বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন এ দুই নদীপথে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি বাল্কহেড চলাচল করে। এ বিপুলসংখ্যক নৌযান থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের ঘটনায় চালক ও শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
ভুক্তভোগী বাল্কহেডচালক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, চ্যানেল চার্জ আদায়ের সময় একটি রশিদ দেওয়া হয়। রশিদের ওপরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অনুমোদনের কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে আদায়কারীর স্বাক্ষর বা ইজারাদারের স্বাক্ষর থাকে না। এমনকি কত টাকা চ্যানেল চার্জ হিসেবে দিতে হবে, তারও কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ রশিদে উল্লেখ নেই বলে দাবি তাদের।
তাদের ভাষ্য, আগে প্রতি বাল্কহেড থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত চ্যানেল চার্জ দেওয়া হতো। বর্তমানে একই খাতে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। নির্ধারিত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি দেখানো, হয়রানি এবং মারধরের জন্য তেড়ে আসার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
চালক ও শ্রমিকদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা হচ্ছে। ফলে নদীপথে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ভুক্তভোগী বাল্কহেডের সুকানি বিল্লাল, মুস্তাকিন, কামাল ও জলিল বলেন, আগে চ্যানেল চার্জ বাবদ ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিতে হতো। এখন প্রতিটি বাল্কহেড থেকে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে।
তারা বলেন, টাকা দিতে না চাইলে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। কখনো মারতে আসার ঘটনাও ঘটে। জোর করে আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাওয়া হয়।
কারা টাকা আদায় করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বিআইডব্লিউটিএর লোকজন টাকা নিচ্ছেন বলে দাবি করেন। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি তারা।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতাদের নেতৃত্বে নদীতে বাল্কহেড থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
নদীপথে প্রকাশ্যে এভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, চ্যানেল চার্জ আদায়ের বৈধতা, ইজারার শর্ত, আদায়ের পরিমাণ এবং অর্থ সংগ্রহে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্ত করে দেখা হোক। একই সঙ্গে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ কার্গো ট্রলার বাল্কহেড শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ লাল চাঁদ মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদ শেখ অভিযোগ করেন, যমুনা নদীতে বাল্কহেড এবং শ্রমিকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। তাদের ভাষায়, এসব কর্মকাণ্ডে জলদস্যুরা জড়িত।
ইউনিয়নের নেতারা বলেন, নদীপথে চলাচলকারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যারা জোরপূর্বক টাকা দাবি করছেন, তাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে লুৎফর মৃধার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি উত্তেজিত হয়ে ফোনটি বন্ধ করে দেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, ইজারাদার মো. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ত্রিনাথ সাহা বলেন, নদীতে বাল্কহেড থেকে কারা চাঁদাবাজি করছে, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নদীপথে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ও চালকদের অভিযোগ, চ্যানেল চার্জের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে বৈধভাবে নির্ধারিত ফি থাকলে তার পরিমাণ, আদায়ের অনুমোদিত পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট ইজারাদারের পরিচয় প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন বৈধ রাজস্ব আদায় নিয়ে বিভ্রান্তি কমবে, অন্যদিকে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগেরও নিষ্পত্তি সম্ভব হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : খান মোহাম্মদ জহুরুল হক
কার্যালয় : রাজবাড়ী প্রেসক্লাব ভবন, কক্ষ নং : ৩ (নীচতলা),
প্রধান সড়ক, রাজবাড়ী।
ফোন : ০১৭১১-১৫৪৩৯৬, ০১৯৭১১-৫৪৩৯৬
ই-মেইল : rajbariprotidin409@gmail.com
স্বত্ব © ২০২৬ রাজবাড়ী প্রতিদিন