
সোহেল রানা : রাজবাড়ীর পাংশায় ২ তরুনকে অপহরণের পর ভারতে পাচারের মামলায় মোঃ রেজাউল মন্ডল (১৮) ও মোঃ শাহীদুল মিয়া (২৭) নামে ২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছে। মোঃ রেজাউল মন্ডল পাংশা উপজেলার ধুলিয়াট গ্রামের আদো মন্ডলের ছেলে ও মোঃ শাহীদুল মিয়া একই গ্রামের মৃত আতর আলী মিয়ার ছেলে।
সোমবার দুপুরে রাজবাড়ী মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোঃ তহিদুল ইসলাম এ রায় প্রদান করেন। রায়ের সময় আসামী মোঃ রেজাউল মন্ডল ও মোঃ শাহীদুল মিয়া পলাতক ছিলেন।
মামলা সুত্রে জানাগেছে, মোঃ একলাস উদ্দিন মালিথা মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এর ৭ ও ১০(১) ধারায় আসামী মোঃ রেজাউল মন্ডল সহ অজ্ঞাত ৭-৮ জন আসামীর বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ২৬ মে পাংশা থানার মামলা দায়ের করেন। তিনি অভিযোগ করেন, মোঃ একলাস উদ্দিন মালিথার পুত্র মোঃ ফারুক ওরফে মারুফ (১৬) পাংশা থানার বাগদুলী গ্রামে তার নানা মোঃ সাবিন বেপারীর বাড়ীতে থেকে লেখাপড়া করতেন। সে ২০১২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। মোঃ রেজাউল মন্ডলের বন্ধু মোঃ ফারুক ওরফে মারুফ। গত ২০১২ সালের ১০ মে রাত ১০ টার সময় মোঃ রেজাউল মন্ডলসহ অজ্ঞাতনামারা পরস্পর যোগসাজসে মোঃ ফারুক ওরফে মারুফ ও তার খালাতো ভাই মোঃ আজিজুল ইসলামকে (১২) বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার নাম করে ভারতে পাচার করার উদ্দেশ্যে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ১৭ দিন পরে মোঃ আজিজুল ইসলাম পাচারকারীদের হেফাজত থেকে কৌশলে পালিয়ে যশোর শহরের পালবাড়ীর মুক্তির মোড়ে এসে চায়ের দোকানদারের মোবাইল ফোন থেকে ঘটনা বাড়ীতে জানান। এরপর মোঃ ফারুক ওরফে মারুফের বাবা মোঃ একলাস উদ্দিন মালিথা পাংশা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরে তদন্তে প্রকাশিত হয় যে, মোঃ রেজাউল মন্ডল ও মোঃ শাহীদুল মিয়া অজ্ঞাত পাচারকারীদের সাথে যোগসাজসে ভারতে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার নাম করে গত ২০১২ সালের ১০ মে রাত ১০ টার দিকে মোঃ ফারুক ওরফে মারুফ ও মোঃ আজিজুল ইসলামকে প্রথমে মটর সাইকেলে করে পাংশা থানার আজিজ সরদার বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে গিয়ে তাদেরকে অপরিচিত দুইজন পাচারকারীর কাছে হস্তান্তর করে। সেখান থেকে ওই ২ জন অপরিচিত পাচারকারী মোঃ ফারুক ওরফে মারুফ ও মোঃ আজিজুল ইসলামকে একটি পিকআপে করে পোড়াদহ রেলওয়ে স্টেশনে নিয়ে যায়। ট্রেনে উঠিয়ে পানীয় জাতীয় কিছু পান করিয়ে তাদেরকে অজ্ঞান করে ফেলে। এরপর তারা ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে মোঃ ফারুক ওরফে মারুফ ও মোঃ আজিজুল ইসলামকে একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখে। পাচারকারীরা সেখানে থেকে প্রথমে মোঃ ফারুক ও মারুফকে ভারতে পাচার করে। কয়েক দিন পরে মোঃ আজিজুল ইসলাম কৌশলে পাচারকারীদের হেফাজত থেকে পালিয়ে যশোর শহরের পালবাড়ীর মুক্তির নামক স্থানে এসে একটি চায়ের দোকানদারের ফোন থেকে বাড়ীতে ঘটনা জানায়। পাংশা থানার পুলিশ যশোর জেলার পালবাড়ীর মুক্তির মোড় থেকে মোঃ আজিজুল ইসলামকে উদ্ধার করে। এরপর থেকে মোঃ ফারুক ওরফে মারুফের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পাংশা থানার এসআই কামাল হোসেন ভূঁইয়া এ মামলাটি তদন্ত করেন। তদন্তে মোঃ রেজাউল মন্ডল ও মোঃ শাহীদুল মিয়ার বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
পাবলিক প্রসিকিউটর (পি.পি) জাহিদ উদ্দিন মোল্লা বলেন, মামলাটি প্রমাণের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ৮ জন সাক্ষীকে পরীক্ষা করা হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত হওয়ার পরে প্রমানিত হয় মোঃ রেজাউল মন্ডল ও মোঃ শাহীদুল মিয়া মানব পাচারকারী দলের সক্রিয় সদস্য। তারা অজ্ঞাত পাচারকারীদের সাথে পরস্পর যোগসাজসে মোঃ ফারুক ওরফে মারুফ ও মোঃ আজিজুল ইসলামকে ভারতে পাচার করার উদ্দেশ্যে যশোর জেলার ভারতীয় সীমান্তে নিয়ে আটকে রাখে। তারপর তারা মোঃ ফারুক ওরফে মারুফকে ভারতে পাচার করে দেয়। যার আজ পর্যন্ত পাওয়া কোন সন্ধান যায়নি।
পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, অপর ভুক্তভোগী মোঃ আজিজুল ইসলাম কৌশলে পাচারকারীদের হেফাজত থেকে পালিয়ে আসেন। তিনি এ ট্রাইব্যুনালে আসামীদের বিরুদ্ধে ঘটনার বিবরণ দিয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেন। মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মোঃ রেজাউল মন্ডল ও মোঃ শাহীদুল মিয়াকে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এর ৭ ও ১০(১) ধারার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এর ৭ ধারার অপরাধে আসামী মোঃ রেজাউল মন্ডল মোঃ শাহীদুল মিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ (১) ধারার অপরাধে দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
