বিশেষ প্রতিনিধি: রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একসময় জমজমাট ছিল অভিজাত ও মাঝারি শ্রেণির শপিং মলগুলো। কেনাকাটার জন্য এসব বিপণিবিতানে ক্রেতাদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে কেনাকাটার ধরন, বদলেছে ক্রেতাদের পছন্দ ও সামর্থ্য। বিশেষ করে ফুটপাতজুড়ে গড়ে ওঠা সস্তার দোকানপাটের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না অনেক শপিং মল। ক্রেতার অভাবে কোথাও দোকান বন্ধ হচ্ছে, কোথাও ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। অন্যদিকে ফুটপাত দখল করে পরিচালিত এসব অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার কারণে একদিকে যেমন সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে নগরজীবনে বাড়ছে যানজট ও জনদুর্ভোগ। এই পরিস্থিতিতে হকারদের উচ্ছেদের পাশাপাশি তাদের নিবন্ধন, নির্দিষ্ট ব্যবসাস্থল ও নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর কাকরাইলের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। গত শতাব্দীর শেষ দিকে চালু হওয়া এই বিপণিবিতান একসময় ছিল মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের পছন্দের জায়গা। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, গয়না থেকে শুরু করে নানা ধরনের পণ্য কিনতে এখানে ক্রেতাদের সমাগম ঘটত। কিন্তু ক্রমাগত ক্রেতা কমতে থাকায় ব্যবসায়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে বিপণিবিতানটি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে গত ১ অক্টোবর দোকান মালিকরা সম্মিলিতভাবে এটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৯৮ সালে কর্ণফুলী গ্রুপের নির্মাণ করা ২০ তলা ভবনের বেজমেন্ট ও চারটি তলা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ভবনের অন্য তলাগুলোতে রয়েছে আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট। বিপণিবিতানটিতে ছিল ১৯৮টি দোকান, যার মালিকানা কিনেছিলেন ১২৫ জন ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনতে গুনতে শেষ পর্যন্ত দোকান বন্ধের পাশাপাশি নিজেদের মালিকানা বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির মতো পরিস্থিতি রাজধানীর আরও কয়েকটি শপিং মলে দেখা যাচ্ছে। একসময় অভিজাত হিসেবে পরিচিত ইস্টার্ন প্লাজাও এখন আগের জৌলুশ হারিয়ে রুগ্ণ অবস্থায় রয়েছে। ইস্টার্ন মল্লিকা, পুলিশ প্লাজা, রাপা প্লাজা, সীমান্ত স্কয়ার, হোসাফ টাওয়ার, মৌচাক মার্কেট, মিরপুরের শাহ আলী মার্কেট ও সেঞ্চুরি অর্কেডেও ক্রেতার উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক কম। এসব বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের মুখে রয়েছেন। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তাঁদের অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারেন।
মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতাদের কথা বিবেচনা করেই এসব শপিং মল গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই ক্রেতাদের একটি বড় অংশ কেনাকাটার জন্য বেছে নিচ্ছেন ফুটপাতের দোকান। কারণ, শপিং মলের কাছাকাছি মানের অনেক পণ্য ফুটপাতেই তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। ফলে ক্রেতারা কম খরচে কেনাকাটার সুযোগ নিতে ফুটপাতমুখী হচ্ছেন।
তবে শপিং মল ও ফুটপাতের ব্যবসার ব্যয়ের কাঠামো এক নয়। শপিং মলের দোকানিদের দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, ভ্যাট, করসহ নানা ধরনের ব্যয় বহন করতে হয়। অন্যদিকে ফুটপাতের অধিকাংশ হকারকে এসব ব্যয় নিয়মিতভাবে দিতে হয় না। ফলে তাঁদের পণ্যের দাম তুলনামূলক কম রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু এই কম দামের পেছনে রয়েছে আরেকটি বড় সমস্যা। অধিকাংশ ফুটপাতের দোকানের নেই বৈধ নিবন্ধন, নেই যথাযথ তদারকি কিংবা জবাবদিহি। নিম্নমানের পণ্য বিক্রি এবং ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে।
ক্রেতারা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পণ্য কিনে কিছুটা সাশ্রয় করতে পারলেও এর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। নিবন্ধনহীন ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পণ্য বিক্রি হলেও সেখান থেকে সরকার যথাযথ রাজস্ব পাচ্ছে না। ফলে ভ্যাট ও আয়করের মতো খাত থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে। এই রাজস্ব ঘাটতির প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ে। অর্থাৎ কম দামে কেনাকাটার সুবিধা থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার কারণে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে।
ফুটপাত দখল করে হকারি ব্যবসা পরিচালনার পেছনে রয়েছে একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে এসব অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে হকারদের ব্যবসা চললেও এর বিনিময়ে সরকার কোনো রাজস্ব পায় না। বরং সাধারণ মানুষকে এর মূল্য দিতে হয়।
ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা স্বাভাবিকভাবে চলাচলের সুযোগ হারাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তাঁদের মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এতে যানবাহন ও পথচারীর চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে, বাড়ছে যানজট। যানজটের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে দোকানপাট বসানোর কারণে নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। হকারদের একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনার পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে মিরপুর, উত্তরা ও নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার সামনের ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। উচ্ছেদের পর পুনরায় যাতে সেখানে দোকান বসানো না যায়, সে জন্য ফুটপাতের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। অন্যদিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানের পর দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের যানজট ও হকারদের জটলা কমে যাওয়ায় পথচারীরা এখন তুলনামূলক স্বচ্ছন্দে চলাচল করতে পারছেন।
এ ধরনের উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর ফুটপাতগুলো পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি যানজট কমানো, নগরের পরিবেশ উন্নত করা এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হকারদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনার আলোকে এখন তাঁদের ফুটপাত থেকে সরিয়ে বিকল্প ব্যবসাস্থল তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ, শুধু উচ্ছেদ করে হকারদের জীবিকার পথ বন্ধ করে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হলেও কয়েক দিনের মধ্যে আবার হকারদের ফিরে আসার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা কিংবা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে অনেক এলাকায় আগের পরিস্থিতি ফিরে এসেছে। এবার যাতে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য সিটি করপোরেশন বিকল্প ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসনের জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্ধারিত স্থানে তাঁদের নিয়মিত ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। শুধু সপ্তাহে দুই দিন হলিডে মার্কেটে বসার সুযোগ দিলে অনেক হকারের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট এলাকায় প্রতিদিন ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য সময়সূচি হিসেবে বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ব্যবসা পরিচালনার কথা ভাবা হচ্ছে। প্রয়োজনে এসব স্থানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হতে পারে।
তবে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। হকারদের কাছ থেকে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী, স্থানীয় প্রভাবশালী কিংবা অন্য কোনো পক্ষ যেন অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করতে না পারে। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের কাছ থেকে যৌক্তিক ফি বা সার্ভিস চার্জ নেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে হকারদের ব্যবসার জন্য একটি বৈধ পরিবেশ তৈরি হবে এবং তাঁদের আয়ের একটি অংশ সরকারি রাজস্ব হিসেবেও জমা পড়বে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে হকারের সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। শুধু ঢাকা শহরেই এ সংখ্যা প্রায় চার লাখ। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার হকার বিভিন্ন সমিতির সদস্য। বাকি প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার ভ্রাম্যমাণভাবে ব্যবসা করেন। তবে বেসরকারি বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে হকারের প্রকৃত সংখ্যা ২০ লাখের কম নয়। সংখ্যার এই পার্থক্য থেকেই বোঝা যায়, হকারদের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি করা কতটা জরুরি।
হকারদের নিবন্ধনের আওতায় আনা হলে তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা, ব্যবসার ধরন ও কর্মস্থল সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে তাঁদের কাছ থেকে নির্ধারিত নিবন্ধন ফি ও নিয়মিত সার্ভিস চার্জ আদায় করা সম্ভব হবে। বর্তমানে হকারদের কাছ থেকে বিভিন্ন মহল যে অর্থ আদায় করে, তার বড় অংশই সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে সেই অর্থের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় রাজস্বে যুক্ত করা সম্ভব।
নিবন্ধিত হকারদের জন্য পরিচয়পত্র, নির্দিষ্ট ব্যবসাস্থল, সময়সূচি ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকতে পারে। এতে তাঁদের ব্যবসার বৈধতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থও সুরক্ষিত হবে। পণ্যের মান নিয়ে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট হকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শপিং মলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হকারদের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও একটি ভারসাম্য তৈরি হবে। কারণ, তখন উভয় পক্ষকেই নির্দিষ্ট নিয়ম ও আর্থিক দায়বদ্ধতার মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ফুটপাতের হকারদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা ছিল। তবে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক দেশই এই সমস্যাকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দিয়েছে। যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এসব দেশে হকারদের পুরোপুরি উচ্ছেদ না করে তাঁদের নিবন্ধন, নির্দিষ্ট স্থান ও সময়সূচির আওতায় এনে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একসময় ফুটপাতের হকারদের কারণে যানজট, পথচারীদের ভোগান্তি ও পর্যটন খাতে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। অনেক হকার স্থানীয় প্রভাবশালী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থ দিয়ে যেখানে-সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। নিবন্ধন না থাকায় তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা কিংবা অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন ছিল।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংকক কর্তৃপক্ষ প্রথমে হকারদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়। এরপর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে তাঁদের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। নিবন্ধিত হকারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা, দোকান বসানোর স্থান ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে তাঁদের কাছ থেকে মাসিক সরকারি ফি আদায়ের ব্যবস্থা চালু করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এই ফি ছিল ১০০ বাথ, যা পরবর্তী সময়ে বাড়িয়ে দেড় হাজার বাথ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
এই ব্যবস্থার ফলে হকারদের ব্যবসা একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আসে। একই সঙ্গে ফুটপাতের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পথচারীদের চলাচল ও যানবাহন ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়। বর্তমানে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন স্ট্রিট মার্কেট ও স্ট্রিট ফুড কেন্দ্র পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম জায়গা। সিঙ্গাপুরেও পরিকল্পিত নাইট মার্কেট ও হকার সেন্টার পর্যটন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।
এসব অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, হকারদের জীবিকা ও নগরের শৃঙ্খলা পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে দুটিই নিশ্চিত করা সম্ভব। বরং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার পরিবর্তে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ম মেনে ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি করা গেলে হকাররাই উপকৃত হবেন।
বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে হলে প্রথমেই একটি জাতীয় পর্যায়ের হকার নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এর আওতায় সারা দেশের হকারদের নিবন্ধন, পরিচয়পত্র প্রদান, ব্যবসার ধরন অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস এবং নির্দিষ্ট কর্মস্থল নির্ধারণ করতে হবে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করে সেখানে হকারদের জন্য বাজার বা নির্ধারিত ব্যবসাস্থল গড়ে তোলা যেতে পারে।
নিবন্ধন ফি হিসেবে এককালীন এক হাজার টাকা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ব্যবসার স্থান ও সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী মাসিক বা দৈনিক সার্ভিস চার্জ নেওয়া সম্ভব। তবে এই অর্থ আদায়ের বিনিময়ে হকারদের নিরাপত্তা, ব্যবসার নিশ্চয়তা এবং চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব হবে অবৈধ অর্থ আদায় বন্ধ করা এবং নির্ধারিত নিয়মের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
হকারদের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোতে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের বাইরে ফুটপাত বা সড়কে দোকান বসানো বন্ধ করতে হবে। নিয়ম ভঙ্গ করলে সতর্কতা, জরিমানা এবং প্রয়োজনে নিবন্ধন বাতিলের মতো ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব যেন কোনোভাবেই নিয়ম বাস্তবায়নে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
হকারদের উচ্ছেদ করাই সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়; তাঁদের একটি নিয়মতান্ত্রিক ও বৈধ কর্মসংস্থানের আওতায় নিয়ে আসাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। এতে একদিকে পথচারীদের ফুটপাত ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে হকারদের জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে। সরকার পাবে নতুন রাজস্বের উৎস, কমবে অবৈধ চাঁদাবাজি এবং পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির মতো বিপণিবিতানগুলোও অনিয়ন্ত্রিত ও অসম প্রতিযোগিতার চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। কারণ, শপিং মলের ব্যবসায়ীরা যেমন ভাড়া, কর ও অন্যান্য ব্যয় বহন করেন, তেমনি হকারদের ব্যবসাও তখন নির্ধারিত ফি, নিয়ম ও জবাবদিহির আওতায় পরিচালিত হবে।
ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং হকারদের পুনর্বাসন—দুটিকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কেবল উচ্ছেদ অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছ নিবন্ধন, নিয়মিত তদারকি এবং চাঁদাবাজি বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই এ উদ্যোগ সফল হবে। এতে নগরের সৌন্দর্য ও চলাচলের পরিবেশ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি হকারদের কর্মসংস্থান, শপিং মলের ব্যবসা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : খান মোহাম্মদ জহুরুল হক
কার্যালয় : রাজবাড়ী প্রেসক্লাব ভবন, কক্ষ নং : ৩ (নীচতলা),
প্রধান সড়ক, রাজবাড়ী।
ফোন : ০১৭১১-১৫৪৩৯৬, ০১৯৭১১-৫৪৩৯৬
ই-মেইল : rajbariprotidin409@gmail.com
স্বত্ব © ২০২৬ রাজবাড়ী প্রতিদিন