
সিরাজুল ইসলাম : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় অসাধু ডিলারের কারসাজিতে বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ডিলাররা সরকারি দামের অতিরিক্ত দামে খুচরা ডিলারদের নিকট সার বিক্রি করছেন।
আমনের ভরা মৌসুমে সার ডিলারদের এমন কারসাজিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডিলারদের সার উত্তোলন, মজুত ও বিতরণের বিষয়টি যথাযথভাবে মনিটরিং করছে না কৃষি বিভাগ। কিছু ক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে নানা অনিয়ম করছেন ডিলাররা। প্রত্যেক ডিলারকে ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাজারের নিজস্ব ঘর থেকে সরকারী দামে কৃষকদের কাছে সার বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২৪ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ করা হয়েছে। কৃষকদের মাঝে সরকারি মূল্যে রাসায়নিক সার বিতরণের জন্য উপজেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসি’র ৫ জন ডিলার রয়েছে এদের প্রত্যেকের অধিনে ইউনিয়ন পর্যায়ে নয়জন করে ৪৫ জন খুচরা ডিলার রয়েছে। সার বিপণন নীতিমালা মোতাবেক প্রতিটি ইউনিয়নের ডিলারদের নিকট সরকারী দামে সার বিক্রি করবে।
কিন্তু উপজেলা পর্যায়ের বিসিআইসি ও বিএডিসি’র ৫ জন ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারা খুচরা ডিলারদের নিকট সরকারি দামে সার বিক্রি করেন না। তাছাড়া বিভিন্ন অজুহাতে সবাইকেই সার দেন না। সার নেই এই অজুহাতে বস্তা পতি ১০০/৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার বিক্রি করেন। তাছাড়া মেসার্স হোসেন বেপারী ও মেসার্স স্বপন কুমার সাহা সহ প্রায় সবার বিরুদ্ধে এ সমস্ত খুচরা ডিলারদের বাইরে ও সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
দৌলতদিয়া ইউনিয়নের দ্বায়িত্বে মেসার্স খন্দকার ফারুক হোসেন ট্রেডার্স এর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারা ডিলারদের নিকট থেকে বেশি দামে সার বিক্রি করে থাকেন। অধিকাংশ খুচরা ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, বস্তা প্রতি বেশি দাম না দিলে সার দেন না। অনেক সময় সার নেই বলে বাইরে বিক্রি করে দেন। বিশেষ করে ১ হাজার ৫০ টাকার এমওপির দামও বস্তায় ৫০০ টাকা বেশি নেওয়া হয় এবং অনেক সময় সার দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের অভিযোগ, তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত কৃষি কর্মকর্তা, ডিলার ও অবৈধ সার বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট সার বিতরণ, বিক্রি ও ইচ্ছামতো দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে সারের ৫০ কেজির বস্তা কিনতে স্থানভেদে কৃষককে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে হাজার টাকা। অথচ মাসে মাসে জেলা-উপজেলার সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির বৈঠকে দেখানো হচ্ছে সারের কোনো সংকট নেই, দামও বাড়েনি। কিন্তু মাঠের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন।
ভুক্তভোগী কৃষকরা বলছেন, সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। ভেতরে ভেতরে চলে টাকার খেলা। অসাধু ডিলারদের সঙ্গে এলাকার কৃষি কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি লাখো কৃষক। সিন্ডিকেট ভাঙতে এগিয়ে আসেননি জেলা মনিটরিং কমিটির কর্মকর্তারা।
মেসার্স হোসেন আলী বেপারির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তার অধিনে থাকা নয়জনের মধ্যে কয়েকজনকে নিয়মিত সার দিলেও আনোয়ার সহ অনেকেই নিয়মিত সার পান না। তাছাড়া তিনি মোমিন খার হাট সহ আশেপাশের এলাকায় সার বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ডিলারদের রয়েছে আলাদা সিন্ডিকেট যেখানে সবাই একত্রিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী কৃষক জানিয়েছেন, সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা। অসাধু ডিলারদের সঙ্গে তাদের গাঁটছড়া খুবই শক্তিশালী। আর মাঠ পর্যায়ের শত শত অবৈধ খুচরা সার বিক্রেতাও এই সিন্ডিকেটে জড়িত। উপজেলার দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম, উজান চর এবং ছোট্ট ভাকলা ইউনিয়নসহ পৌর এলাকার কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠজুড়ে চলছে আমন আবাদের ধুম। মাঠে মাঠে জমি তৈরির কাজ করছেন কৃষক। কোথাও কোথাও আগাম জাতের আমন রোপণে ব্যস্ত তারা। আগস্টের শেষ নাগাদ চলবে এ কর্মযজ্ঞ। কৃষকরা আমনের ভালো ফলন পেতে বিভিন্ন সারের খোঁজে নানা প্রান্তে ছুটছেন। সামর্থ্যবান কৃষকরা বেশি টাকা দিয়ে অবৈধ দোকান থেকে সার নিতে পারলেও মাঝারি ও প্রান্তিক কৃষক এক-দুই বস্তা সারও কিনতে পারছেন না।
উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের আইনদ্দিন প্রামাণিকের পাড়ার কৃষক আক্তার হোসেন বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও সার পাচ্ছেন না কৃষক। দোকানে গেলে ডিলার বলেন সার নেই। বাধ্য হয়ে তারা বেশি দামের খুচরা দোকানে ভিড় করছেন।
জানাযায়, অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে কৃষক পর্যায়ে ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপির দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একইভাবে ডিএপি ১ হাজার ৫০ এবং এমওপি ১ হাজার ৫০ টাকা করা হয়। কিন্তু এই দামে এখন কোথাও সার মিলছে না। উপজেলার অধিকাংশ কৃষকরা জানান, টিএসপির বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। কোথাও আরও বেশি। একইভাবে ডিএপির বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ টাকায় এবং ১ হাজার ৫০ টাকার এমওপির দামও বস্তায় ৫০০ টাকা বেশি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দৌলতদিয়া ইউনিয়নের মেসার্স খন্দকার ফারুক হোসেন, দেবগ্রাম ইউনিয়নের মেসার্স হোসেন আলী বেপারি, ছোট্ট ভাকলা ইউনিয়নের মেসার্স সপ্তবর্না ট্রেডার্স এর অধিনে থাকা প্রায় ২৭ জন খুচরা ডিলারের নিকট সেভাবে পন্য সরবরাহ করে না। এছাড়া পৌর এলাকায় স্বপন কুমার সাহার বিরুদ্ধে রয়েছে উপজেলার বাইরে সার বিক্রির অভিযোগ। সিন্ডিকেটটি কৃষকদের কাছে সার বিক্রি না করে বেশি দামে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে। এতে বাজারে সব সময় সারের সংকট থাকে। এ সুযোগে খুচরা ব্যবসায়ীরা সরকারি মূল্যের দ্বিগুণ দামে সার বিক্রি করছেন।
এ বিষয়ে সার ডিলার মেসার্স হোসেন আলী বেপারি ট্রেডার্স থেকে জানানো হয় তারা যেভাবে সার পান সেভাবেই বিক্রি করেন এবং সবাইকে সার দেন। কিন্তু খুচরা বিক্রেতারা তাদের এসমস্ত কথা অস্বীকার করেন এবং বাস্তবতা তুলে ধরেন। তারা বলেন আমরা সঠিক দামে সেই হিসেবে বিক্রি করতাম। তাছাড়া তাদের টাকা বাকি রাখা যায় না কিন্তু আমরা যারা কৃষকদের নিকট বিক্রি করি। আমাদের টাকা দিনের পর দিন পরে থাকে তাছাড়া তারা সরাসরি ডিলারের বাইরে খুচরা দোকানে সার বিক্রি করে আসছে। উপজেলায় বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এর বাস্তবতা দেখা যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সৈয়দ রায়হানুল হায়দার বলেন, ডিলারদের বিষয়ে নিয়মিত পরিদর্শন করা হয় এবং দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বলা হয়। তবে বেশি দামে সার বিক্রি করলেএ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদা বলেন, আমি নতুন আসছি। এই বিষয়ে জানলাম কৃষি কর্মকর্তার সাথে কথা বলে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া সারের দাম বেশি রাখার সূযোগ নেই নিয়মিত বাজার ব্যাবস্থা মনিটরিং করা হবে।
