
সাখাওয়াত হোসেন সোহান : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলমের ঘুষ বানিজ্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেজবুকে ভাইরাল হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১০ই সেপ্টেম্বর) তার ঘুষ নেওয়ার একটি গোপন ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে, পরে তা ভাইরাল হয়।
ওই ভিডিও’তে দেখা যায়, নির্বাচন কর্মকর্তা তার চেয়ারে বসে একজন প্রবাসীর নতুন ভোটার আইডি করে দেওয়ার কথা বলে ঘুষের টাকা গ্রহণ করছেন। মুহূর্তের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা ঝড় ওঠে।
ভুক্তভোগী রাসেল মোল্লা বলেন,আমি বাহরাইন প্রবাসী। ছুটিতে বাড়ীতে এসেছি। পুর্বে আমার কোন ভোটার আইডি ছিলো না। আমি ২০১৩ সালে জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পার্সপোর্ট বানিয়ে বিদেশ গিয়েছি। ঘটনার দিন আমি নতুন ভোটার আইডি কার্ড করার জন্য উপজেলা নির্বাচন অফিসে গেলে, নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলম আমার কাছে ৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবী করেন। আমি ওনাকে বহু কাকুতি মিনতি করে ২ হাজার টাকা দেই।
রাসেল মোল্লা আরও বলেন, আমি ব্রেন টিউমারে অসুস্থ ছিলাম। একথা নির্বাচন কর্মকর্তাকে বলার পরেও, ওনি নানা অজুহাতে আমাকে তিন-চার দিন ঘুরায়েছে। পরে টাকা দিতে রাজি হলে ওনি আমার ভোটার আইডি করে দেন।
এসময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, শুধু আমি নই। কোন ব্যক্তিই নির্বাচন অফিসে টাকা ছাড়া কোন সেবা পায় না। এই অফিসের প্রত্যেকটা লোক টাকা খায়। টাকা না দিলে কুকুরের মত দুরব্যবহার করে। আমি একজন রেমিট্যান্স যুদ্ধ হিসেবে এই অসৎ দুর্নীতিবাজ নির্বাচন কর্মকর্তা শাস্তি দাবী করছি।
এদিকে, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে নির্বাচন অফিসের বছরের পর বছর ধরে চলা কর্মকর্তার নানাবিধ অনিয়ম, অপকর্ম ও ঘুষ বানিজ্য নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা। এসময় ভুক্তভোগীরা নির্বাচন কর্মকর্তা বিচার দাবী করেন। কেউ বলছেন, নির্বাচন অফিসে টাকা ছাড়া কোন সেবা মিলে না। টাকা না দিলে নানা তাল-বাহানায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের লম্বা একটা তালিকা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। তালিকা এমন, যা বেশিরভাগ সেবা প্রত্যাশির পক্ষে ম্যানেজ করা দুরূহ। পরিনয়ে মাসের পর মাস ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলে না। অথচ, দালাল ধরে টাকা দিলেও সেবা মিলে। যেকোন বড় সমস্যা মুহুর্তের মধ্যে সমাধান হয়ে যায়। তখন আর কাগজপত্রের প্রয়োজন হয় না।
কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচন কর্মকর্তার যোগসাজোশে দালাল চক্রের মাধ্যমে এ ঘুষ বানিজ্য চলে। এ চক্রের বেশিরভাগ সদস্য স্থানীয় কম্পিউটার দোকানদার। এদের হাতে টাকা দিলেই তা মুহূর্তের মধ্যে পৌছে যায় নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে। ফলে নতুন ভোটার আইডি করে দেওয়া,আইডি কার্ডে নামের ভুল বানান সংশোধন করা,পিতা ও মাতার নাম সংশোধন সহ যাবতীয় কাজ খুব সহজেই হয়ে যায়। একেকটি কাজে সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া অভিযোগ রয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি বলেন, আমি জরুরি ভিত্তিতে বিদেশ যাওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ভোটার আইডি করেছি। এই অফিসের কেউ টাকা ছাড়া কোন কাজ করে না। তিনি আরও বলেন,আপনি টাকা দিবেন কাজ হবে। আপনি টাকা না দিলে আপনাকে আইনের প্যাচে ফেলে মাসের পর মাস ঘুরাবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলমের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, আমি কোন মন্তব্য করতে পারব না।
এদিকে, নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলমের ঘুষ বানিজ্যের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও, তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি এখনও বহাল তবিয়তে নিজ কর্মস্থলে রয়েছেন।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল হুদা বলেন, আমি নির্বাচন অফিসের উর্দুতন কর্মকর্তাকে বিষয়টা জানিয়েছি, ওনার খবিরুল আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
রাজবাড়ী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন বলেন, ঘুষ নেওয়ার বিষয়টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে আমরা অবগত হয়েছি। খবিরুল আলমের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
ফরিদপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোঃ মাহাবুব আলম শাহ্ বলেন, খবিরুল আলমকে শোকজ করা হয়েছে। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তাকে জাবাবদিহি করতে বলা হয়েছে। খবিরুল আলমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমানিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন অফিস কর্তৃপক্ষ দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহন করেছে। যেই দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
