শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের : গোয়ালন্দে ধর্ষণের শিকার ১২ বছরের শিশু গর্ভবতী : হুমকির মুখে পরিবার

লেখক:
প্রকাশ: ২ দিন আগে

স্টাফ রিপোর্টার : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মোঃ ওয়ালিদ শেখ (২২) নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। রাজবাডী শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক কণিকা বিশ্বাস মামলাটি গ্রহণ করে গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসিকে এফআইআরের নির্দেশ প্রদান করেছেন।
এর পর থেকেই ধর্ষণের শিকার শিশুটির পুরো পরিবার হুমকির মুখে পড়েছে। অপরাধীরা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য মামলার বাদী ধর্ষণের শিকার শিশুর অসহায় মাতাকে প্রতিনিয়ত জীবননাশের হুমকি দিয়ে আসছে। অথচ গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশের কাছে প্রতিকার চেয়ে সামান্য একটি জিডিও করতে পারছেনা ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবারের সদস্যরা।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, ধর্ষণের ফলে ৮ মাসের অন্তঃসত্তা ওই শিশুটিকে বর্তমানে নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হলেও তাকে প্রতিনিয়িত বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ওই অপরাধীরা। এর পরও কোন প্রতিকার পাচ্ছেনা পরিবারটি।
শিশুটির অসহায় মাতা বলেন, এ ঘটনায় জড়িত ওয়ালিদ শেখের বিরুদ্ধে রাজবাড়ীর শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনালে গত ১৩ ই জুলাই তিনি মামলা দায়ের করেন। এরপর আদালত ধর্ষণের শিকার শিশুটিকে তার (মাতা) জিম্মায় দেন। শুরু হয় অপরাধীদের হুমকি ধামকি। আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে এক পর্যায়ে শিশুটিকে অপরাধীরা জোর করেই নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায়।
মামলার বাদী শিশুটির অসহায় মাতার অভিযোগ, মেয়েটিকে জিম্মি করে তারা (অপরাধী চক্র) আমাকে (বাদী) আদালতে যেতে বাধ্য করে এবং মামলার জামিন হাসিল করে।
চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণের ঘটনার একমাত্র আসামী ওয়ালিদ শেখ ফরিদপুর কোতোয়ালী থানার মফিজ উদ্দিন মুন্সির ডাঙ্গী মমিন খার হাট এলাকার মোঃ সেলিম শেখের ছেলে। বর্তমানে সে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাট থানার পূর্ব উজানচর গফুর মন্ডলপাড়া এলাকায় বসবাস করে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ জানুয়ারি বেলা ১২টার সময় গোয়ালন্দ ঘাট থানার পূর্ব উজানচর গফুর মন্ডলপাড়া এলাকায় এ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ঘটনার দিন শিশুটির বাবা ও বাড়ির অন্যান্য পুরুষ সদস্যরা বাড়ির বাইরে জুম্মার নামাজ আদায় করতে মসজিদে যান। বাড়িতে অন্য কোনো পুরুষ মানুষ না থাকার সুযোগে আসামি মোঃ ওয়ালিদ শেখ বাড়িতে প্রবেশ করে। ওই সময় ১২ বছর বয়সী নাবালিকা কন্যা ঘরের ভেতর একা শুয়ে ছিল। আসামি ওয়ালিদ ঘরে ঢুকে মুখ চেপে ধরে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে এবং ঘটনাটি কাউকে জানাইলে খুন জখমের হুমকি দেয়। এভাবে ঘটনার পর আরও কয়েকবার ভয়ভীতি দেখিয়ে আসামী ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। এক পর্যায়ে শিশুটি গর্ভবতী হয়ে পড়ায় শিশুটির আচার আচরণ অস্বাভাবিক পরিলক্ষিত হলে চিকিৎসকের কাছে নেয়ার পর শিশুটি ২২ সপ্তাহের গর্ভবতী হিসেবে শনাক্ত হয়। পরে স্থানীয় মাতব্বর ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানানো হলে তারা বিষয়টি মিমাংসা করার আশ্বাস দিয়ে কালক্ষেপণ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সুষ্ঠু বিচার বা সমাধান না পেয়ে এবং আসামিপক্ষের লোকজনের হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে বাদী আদালতের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন। বাদী পক্ষে আইনজীবি হিসেবে ছিলেন অ্যাড. বিজন কুমার বোস, অ্যাড. ইমরান শেখ ও অ্যাড. আমিনুল ইসলাম আমিন।
এ্যাড. বিজন কুমার বোস বলেন, মামলাটি আদালত আমলে নিয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এফআইআরের নির্দেশ দেন । আদালতের নির্দেশের প্রেক্ষিতে গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশ গত ১৬ জুলাই থানায় মামলা রেকর্ড করেন।
এদিকে মামলা চলমান ও তদন্ত কার্য চলমান থাকলেও আসামী ও তাদের প্রভাবশালী পরিবার বিভিন্নভাবে মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই মামলার একমাত্র আসামী কিছুদিন ফরিদপুরের মমিনখার হাট এলাকার এক নারীকে বিয়ে করে মাত্র কিছুদিনের মাথায় তাদের বিচ্ছেদ হয়। এরপরই ঘটে এই ঘটনা। অথচ আসামীর জন্ম নিবন্ধনে তাকে শিশু হিসেবে জন্ম তারিখ ২১/০১/২০০৯ উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই কাগুজে প্রমান ব্যবহার করে গত থানায় মামলা রেকর্ড হওয়ার মাত্র ২৫ দিনের মাথায় গত ১০ আগস্ট রাজবাড়ীর শিশু আদালত (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল) থেকে জামিন পান চাঞ্চল্যকর ১২ বছরের শিশু ধর্ষণ (বর্তমানে অন্তঃসত্তা) মামলার আলোচিত আসামী ওয়ালিদ শেখ।
এখানেই শেষ নয়, জামিন পেয়েই আসামী ও তার পরিবারের সদস্যরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নির্যাতিত পরিবারের ওপর ভয়-ভীতির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। দ্বিতীয় দফায় শিশুটিকে আবারও জোর করে অপরাধীরা নিজেদের বাড়ীতে নিয়ে যায়। নিরুপায় মাতা ভিকটিমকে নিজের হেফাজতে নেওয়ার জন্য গত ১১ অক্টোবর রাজবাড়ীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের শরণাপন্ন হয়। আদালতের নির্দেশে পুলিশ ওই ভিকটিমকে গত ১৩ অক্টোবর আদালতে হাজির করলে শিশুটির মাতা যথারীতি জিম্মার প্রার্থনা করলে আদালত সন্তষ্টচিত্তে ভিকটিমকে মাতার জিম্মার আদেশ প্রদান করেন। ওইদিন আদালতে ধর্ষণ মামলার আসামী ওয়ালিদের পক্ষে জিম্মার আবেদন জানালে আদালত সেটি নাকচ করে দেন। এ ঘটনার জের হিসেবে গত বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে ওয়ালিদ শেখ, তার ভাই আসাদ শেখ, জাহাঙ্গীর শেখ সহ অন্যান্যরা শিশুটিকে তার বাড়ী থেকে জোর করে নিজেদের বাড়ীতে নিয়ে যায়। এরপর শিশুটির মা থানায় সাধারণ ডাইরী করতে গেলেও পুলিশ সামান্য জিডিও গ্রহণ করেনি। ফলে পরিবার এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
এবিষয়ে এসআই শিহাবুর রহমানের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বললে তিনি জানান, তাদেরকে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।