
সিরাজুল ইসলাম : ক্ষেত থেকে পাট কেটে এখন পানির অভাবে জাগ দিতে পারছি না। ক্ষেতের পাট পচানো বা জাগ দেওয়ার মতো পানি আশপাশের দেড়-দুই কিলোমিটারের মধ্যে নেই। পাট পচানোর সময় পেরিয়ে যাওয়ায় ক্ষেতের পাট শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। বাধ্য হয়েই ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে বেড়িবাঁধের পাশে (ফরিদপুর তাড়াইল সড়ক) পাট পচানোর জন্য নিয়ে যেতে হচ্ছে এতে ঘোড়ার গাড়ির জন্য অতিরিক্ত বিঘা প্রতি দিতে হচ্ছে চার হাজার টাকা। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের রিয়াজুদ্দিন পাড়ার কৃষক সফিক মোল্লা এভাবেই অভিযোগের সুরে কথা গুলো বললেন।
আগে আশে পাশে পানি আসতো তাছাড়া প্রচুর পুকুর ও খাল ছিল কিন্তু এগুলো এখন ভরাট হয়ে যাওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া অনুকূল পরিবেশ এবং ভালো ফলন ও বাজার দর ভালো হওয়ায় কৃষকরা লাভের মুখ দেখছেন। তবে এই বাড়তি খরচ না থাকলে তারা আরও লাভবান হতে পারতো।
আউয়াল প্রামাণিক বলেন, ‘প্রতিবছর পাট কাটার এই সময়ে জমির চারদিক জুইড়্যা কোথাও বুকসমান কোথাও সাঁতারপানি থাকে। কিন্তু এবার চারদিক একেবারে শুকনা। পুষ্ট হওয়ায় দুই সপ্তাহ আগেই পাট কাটা দরকার ছিল। কিন্তু বৃষ্টি আর পানির আশায় থাইক্যাও কুনু কাজ হলো না। তাই ম্যালা দূরে পাট পচানোর জন্য নিয়্যা যাত্যাছি। এতে বিঘায় শুধু পাঁচ হাজার টাকা বেশিই লাগতেছে না, চরম দুর্ভোগও সহ্য করা লাগত্যাছে।’
ক্ষেতের পাট পচানো বা জাগ দেওয়ার মতো পানি আশপাশের দেড়-দুই কিলোমিটারের মধ্যে নেই। আউয়াল প্রামাণিকের মতো এবার পাট পচানো নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার অনেক চাষীরা। অনেকে দূর দুরান্ত থেকে এসে মরা পদ্মায় পাট পচানোর জন্য নিয়ে আসতেছে। এতে পাটের উৎপাদন খরচের সঙ্গে পরিবহন ভাড়া ও কামলা খরচ হিসেবে অতিরিক্ত পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা যুক্ত হচ্ছে।
পাটচাষিরা হিসাব করে জানান, পাট কেটে দূরের কোনো নদী বা জলাশয়ে নিতে প্রতি বিঘার জন্য ট্রলি অথবা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া লাগছে কমপক্ষে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা। এ ছাড়া দূরে নিয়ে সেখানে পচানোর জন্য জাগ তৈরিসহ পাট নিয়ে যাওয়া ও আনা বাবদ চারজন কামলা অতিরিক্ত লাগছে। দৈনিক ৭০০ টাকা হিসেবে ৪ জন কামলার মজুরিবাবদ অতিরিক্ত লাগছে ২ হাজার ৮০০ টাকা। এতে পরিবহন ভাড়া ও কামলা খরচ মিলিয়ে গচ্চা যাচ্ছে কমপক্ষে পাঁচ হাজার টাকা। পাটচাষিরা জানান, অন্য বছর বাড়ি বা জমির কাছে পাট পচানোর পর বাড়ির নারী-শিশুরা পাট ছাড়ানোতে অংশ নিয়েছে। কিন্তু এবার কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে পাট পচানোয় সেখানে নারী-শিশুদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে পাট ছাড়ানো বাবদও অতিরিক্ত খরচ এবার গুনতে হচ্ছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে তোষা জাতের পাটের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার বলেন, “চলতি মৌসুমে গোয়ালন্দ উপজেলায় ৪ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এ মৌসুমে আবহাওয়া পাট চাষের অনুকূলে থাকায় পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম ছিল। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা অব্যাহত ছিল। পাশাপাশি পাট জাগ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত পানির মানও ভালো ছিল। ফলে কৃষকরা উন্নত মানের পাট উৎপাদন করতে পেরেছেন।
পাটচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বিঘা জমিতে চাষাবাদ, সার, পরিচর্যা, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানো মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। এবার প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত পাট উৎপাদনের আশা করছেন তারা। বর্তমানে স্থানীয় হাটবাজারে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অনেক পাইকার সরাসরি কৃষকদের বাড়ি গিয়েও পাট কিনছেন।
কৃষকেরা আরও জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বাজারদর ভালো। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে পাটের আবাদ করবেন তারা।
