{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{"square_fit":1},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":true,"containsFTESticker":false}

সিরাজুল ইসলাম : দেশের বৃহত্তম যৌনপল্লী রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া যৌনপল্লী। এই যৌনপল্লীতে প্রায় দেড় হাজার যৌনকর্মী বসবাস করে। এই পল্লিতে বেশির ভাগ খুনের নেপথ্যে থাকে তাদেরইই ‘ভালোবাসার মানুষ’, ‘প্রেমিক’, ‘বাবু’ বা ‘কথিত স্বামী’। যৌনকর্মীরা তাদের প্রেমিককে ‘বাবু’ বলেই সম্বোধন করে। যৌনকর্মীদের আয়ের একটি বড় অংশ বিভিন্ন প্রলোভনে তারা নিয়ে নেয়। তারপর যৌনকর্মীদের আয়ের সেই টাকা ফেরত চাওয়া নিয়েই এসব খুনাখুনির ঘটনা ঘটে প্রায়ই।
যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করেন এমন সংগঠনের কর্মীরা জানিয়েছেন, যৌনকর্মীরা বেশিরভাগ সময় তার পরিচিত ব্যক্তি ও বাবুদের মাধ্যমেই খুন হয়। অপরিচিত খদ্দেররা কখনও পল্লিতে বা হোটেলে গিয়ে খুন করার সাহস পায় না। কারণ, ওই জায়গা যৌনকর্মীদের, সেখানে অপরিচিত কেউ গিয়ে খুন করতে পারে না। অতীতে অনেক ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে, খুনের নেপথ্যে পরিচিত কোনও বাবু বা দীর্ঘদিনের প্রেমিক বা খদ্দের।
গত ১২ দিনের ব্যবধানে একই ধরনের ঘটনায় দুই যৌনকর্মীর মৃত্যু হয় তাদের ‘বাবু’ ‘প্রেমিক ‘ বা কথিত স্বামীর দ্বারা।
গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দিনের কোনো এক সময় হুসনে আরা খাতুন ওরফে হাসি (৩৬)
নামে এক যৌনকর্মীকে তার নিজ ঘরের ভেতর ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা লাশ উদ্ধার করে থানা পুলিশ। এই ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তার প্রেমিক বা ‘বাবু’ মোস্তাক ডাক্তারকে পরের দিন জিজ্ঞসাবাদের জন্য আটক করে। এই ঘটনায় তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এই ঘটনায় মৃত হুসনেয়ারা খাতুনের আপন ভাই মোঃ হযরত আলী (২৪) ও নিহতের ছোট ভাই হাসান খান (১৯) এবং স্বামী মোঃ সাইদুল ইসলাম (৪২) হাজির হয়ে মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক (৫৫)কে আসামী করে মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেপ্টেম্বর সকাল আনুমানিক ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে কোনো এক সময় হাসিকে তার বসত ঘরে প্রবেশ করে মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে গুরুতর জখম করে তাকে হত্যা করে। পরে সন্ধ্যা ৬টার দিকে রুবেলের কথিত স্ত্রী লাকি দরজা খুলে হাসিকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার দিলে স্থানীয়রা ছুটে আসে এবং গোয়ালন্দ ঘাট থানায় খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে করে। ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট এসে আলামত সংগ্রহ করে।
এ ব্যাপারে নিহতের ভাই মোঃ হযরত আলী বলেন, আসামী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাকের কাছে আমার বোন দুই লক্ষ টাকা পেতেন। এই টাকা একের অধিক বার চাওয়ার কারণে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছি।
এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে সোনিয়া আক্তার নামে আরেক যৌনকর্মী কথিত প্রেমিকের মারধরে আহত হন। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত প্রেমিক জুয়েলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ আগস্ট রাতে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে সোনিয়া আক্তারকে মারপিট করে গুরুতর আহত করেন তার কথিত প্রেমিক বা বাবু মো. জুয়েল। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। পরে অবস্থার আরও অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজধানী ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার তার মৃত্যু হয়। নিহত সোনিয়া আক্তার দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর তোফাজ্জেল হোসেন তপুর বাড়ির ভাড়াটিয়া ছিলেন।
এ ঘটনায় দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর বাড়িওয়ালা তোফাজ্জেল হোসেন তপু বাদী হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মো. জুয়েলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
দৌলতদিয়া যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা মুক্তি মহিলা সমিতির প্রজেক্ট ডিরেক্টর আতাউর রহমান মন্জু বলেন, আগে যৌনকর্মীরা খুন হতো বাইরের লোকজনদের দ্বারা। বিশেষ করে যাদের অনেক সোনাদানা বা টাকা পয়সা থাকতো তাদের টার্গেট করে খুন করা হতো কিন্তু এখন খুন হচ্ছে স্থানীয় তাদের প্রেমিক বা বাবুদের দ্বারা। তবে যৌনপল্লীর প্রায় সব খুনই অর্থের সাথে সম্পৃক্ত।
তিনি আরও বলেন, যৌনপল্লিতে বাইরে থেকে এসে কেউ খুন করে না করবে না। এটা তাদের জায়গা। অধিকাংশ যৌনকর্মীদের কেউ না কেউ ‘বাবু’ বা ‘প্রেমিক’ থাকে। কেউ কেউ তাদের স্বামীও পরিচয় দেয়। এসব ব্যক্তি মেয়েদের উপার্জিত টাকায় ভাগ বসায়। তাদের সারাজীবনের উপার্জিত অর্থ তাদের হাতে তুলে দেয় সেই টাকা নিয়ে তারা ছেড়ে চলে যায় আর পারলে খুনের মতো ঘটনা ঘটে।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, যৌনপল্লীতে কেউ স্বেচ্ছায় আসে না। জীবনের সবচাইতে বিপর্যস্ত মুহূর্তে তাদের এখানে আশ্রয় হয়। তারা যখন এই পেশায় মানিয়ে নিয়ে অর্থ উপার্জন করা শুরু করে তখন তাদের নিরাপদ আশ্রয় দরকার হয়। সেই মুহূর্তে খড়কুটোর মতো ভেসে আসে আশে পাশের কিছু স্বার্থান্বেষি মুখ। তারা তাদের সামনে যেমন ঢাল হয়ে দাড়ায় তেমনি তাদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে। এসময় তাদের কষ্টার্জিত অর্থের ভাগ বসায়। একটা সময় তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতির কারণে কিংবা মেয়েটির চাওয়া পাওয়ার আকাংখায় ঘুরে ফিরে আসে সেই অর্থনৈতিক বিষয়। সেই সময় কোন কুল কিনারা করতে পেরে খুন করার মতো ঘটনা ঘটে। গত ১২ দিনের দুটি খুনের ঘটনায় আমরা নিবির পর্যবেক্ষন এবং তদন্ত করে এই বিষয়গুলো পেয়েছি এবং দুটি ঘটনায় খুনি আটক করা হয়েছে তাদের প্রেমিক বা বাবুরা।
