
সোহেল রানা : ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের জন্য সরকারের বরাদ্দ করা প্রায় ৬ কোটি টাকার ফার্নিচার সরবরাহকারী ঠিকাদারের কাছে ৫০ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবীর অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নানকে ঢাকা মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডি করা হয়েছে। একই সাথে রাজবাড়ী সিভিল সার্জন ডা. এসএম মাসুদকে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ পার-২ শাখার যুগ্ম সচিব সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ জারী করা হয়েছে। আদেশে আগামী ৪ অক্টোবরের মধ্যে বদলীকৃত কর্মস্থলে যোগদান করবেন। অন্যত্থায় বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত (স্ট্যান্ডরিলিস) গণ্য হবে। এ ঘটনায় জেলা জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের জন্য সরকারের বরাদ্দ করা প্রায় ৬ কোটি টাকার ফার্নিচার কেন এখনো হাসপাতালে আসেনি। জনগণের টাকায় কেনা হাসপাতালের আসবাবপত্র সময়মতো হাসপাতালে না আসার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে এক সপ্তাহ সময় বেঁধে দিলাম। এই সময়ের মধ্যে হাসপাতালের আসবাবপত্র হাসপাতালে না এলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী খৈয়ম বলেন, জনগণের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি করা চলবে না। জনগণের স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে আপনাদের সামাজিক দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। হাসপাতালকে ডিসিপ্লিনের মধ্যে আনতে হবে। আমাদের সরকার জনগণের কল্যাণের জন্য কমিটেড। সেই জায়গা থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই। জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। হাসপাতালের কম্পাউন্ডের মধ্যে পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন, রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, হাসপাতালের চিকিৎসকরা হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা না দিয়ে ক্লিনিকে প্র্যাকটিস করা কতটা যৌক্তিক। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এসময় রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ, সদর হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. এস এম এ হান্নান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তারিফ উল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শহিদুল ইসলাম, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম তৌহিদুল ইসলাম, রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসক কল্যাণ চৌধুরী, ডা. রাজিব দে সরকার, সাবেক সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রহিম বক্সসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ডা. শেখ মোহাম্মদ হান্নান দায়িত্ব পালনকালে দুর্ণীতি দমন কমিশন দুদকের টিম ৩ বার অভিযান পরিচালনা করেছেন। অভিযানে নানা অসংগতি পান। তারপরও বহাল থাকার কারণে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। নানা অনিয়ম-দুর্ণীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। প্রভাবশালী হওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেত না। সম্প্রতি রাজবাড়ী আদর্শ ক্লিনিকে অফিস টাইমে সিজারিয়ান রোগীর অপারেশনের পর মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে।
ঢাকা গণপুর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, রাজবাড়ী হাসপাতালের আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য ২ মাস ধরে তত্বাবধায়ককে বলে আসছিলাম। তিনি আমাদের অসহযোগিতা করেছেন। তবে ঘুষ দাবীর বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে তার শাস্তিমূলক বদলী হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সাথে কথা হয়েছে। এ সপ্তাহে আসবাবপত্র সরবরাহ করা হবে।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দাবীর বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কেউ আমার সাথে কোন কথা বলেনি। তাহলে কিভাবে ঘুষ দাবী করলাম।
রাজবাড়ী সিভিল সার্জন ডা. এসএম মাসুদ বলেন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নানকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বদলী করে ওএসডি করা হয়েছে। আমাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। একটি চিঠি হাতে পেয়েছি। তবে ঠিকাদারের কাছে ৫০ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবীর বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের জন্য সরকারের বরাদ্দ করা প্রায় ৬ কোটি টাকার ফার্নিচার সরবরাহকারী ঠিকাদারের কাছে ৫০ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবীর বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাকে বদলী করে সিভিল সার্জনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
