
মো: আমিরুল হক : রাজবাড়ীর কালুখালীতে নিজস্ব ডেইরি ফার্মের দুধ দিয়ে মিষ্টি, রসমালাই, দধি, মাখন ও ঘি তৈরি করে সাশ্রয়ী দামে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন উদ্যোক্তা কাজী সাইফুল ইসলাম। নিজের উদ্যোগ, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে গড়ে তোলা তাঁর ‘আদর্শ ডেইরি অ্যান্ড সুইটস’ এখন স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে। তাঁর এ উদ্যোগে একদিকে যেমন দুগ্ধজাত পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় খামারিদের উৎপাদিত দুধের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মাজবাড়ী ইউনিয়নের কোমরপাড়া গ্রামে গড়ে উঠেছে এ ডেইরি ফার্ম ও মিষ্টান্ন উৎপাদন প্রতিষ্ঠান। উন্নত জাতের গাভী পালন করে উৎপাদিত দুধের পাশাপাশি আশপাশের ছোট খামারিদের কাছ থেকেও দুধ সংগ্রহ করে বিভিন্ন ধরনের দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করছেন কাজী সাইফুল ইসলাম। এসব পণ্য কিনতে স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ আসছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত কাজী সাইফুল ইসলাম জনপ্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে যুক্ত হন ডেইরি খাতে। কালুখালী উপজেলা থেকে ডেইরি প্রকল্পের ওপর বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েকটি উন্নত জাতের গাভী কেনার মাধ্যমে শুরু করেন খামারের যাত্রা। ধীরে ধীরে গাভীর সংখ্যা ও দুধ উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বৃত্ত দুধ কাজে লাগিয়ে দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা করেন তিনি।
বর্তমানে তাঁর দাবি অনুযায়ী, খামারে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা মূল্যের গরু রয়েছে। এসব গাভীর দুধ এবং আশপাশের খামারিদের কাছ থেকে সংগৃহীত দুধ দিয়ে তৈরি হচ্ছে রসগোল্লা, কালোজাম, চমচম, রসমালাই, কাঁচাগোল্লা, প্যারা সন্দেশ, দধি ও ঘিসহ বিভিন্ন পণ্য। খামারের গরুর খাবারের চাহিদা পূরণে নিজস্ব জমিতে ঘাসও চাষ করছেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির মার্কেটিং ম্যানেজার মোঃ নজরুল ইসলাম জানান, মিষ্টান্ন ও দুগ্ধজাত পণ্যের কার্যক্রম শুরু করার পর থেকেই ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। খামারের দুধ দিয়ে তৈরি পণ্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
তিনি জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে প্রতি কেজি রসগোল্লা ২০০ টাকা, লাল দধি ২২০ টাকা, সাদা দধি ২২০ টাকা, কালোজাম ২৫০ টাকা, স্পঞ্জের রসগোল্লা ৩০০ টাকা, বেবি সুইট ৩৫০ টাকা, চমচম ৪০০ টাকা, রসমালাই ৪০০ টাকা, কাঁচাগোল্লা ৪৫০ টাকা, প্যারা সন্দেশ ৫০০ টাকা, টক দই ১৮০ টাকা এবং ঘি ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এসব পণ্যের মান ও বিশুদ্ধতা বজায় রেখে ক্রেতাদের আস্থা অর্জনই তাঁদের মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
দুধের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে চান সাইফুল।
উদ্যোক্তা কাজী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ডেইরি খাতে কাজ শুরু করার পর গাভী পালন ও দুধ উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছি, শুধু তরল দুধ বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যায় না। তাই নিজের খামারের দুধ দিয়ে মিষ্টি, রসমালাই, দধি ও ঘি উৎপাদন শুরু করেছি। অল্প সময়ের মধ্যেই এসব পণ্য ক্রেতাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় প্রচুর দুধ উৎপাদিত হয়। কিন্তু অনেক সময় ছোট খামারিরা তাঁদের দুধের ন্যায্য মূল্য পান না। আমি আশপাশের খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে তা দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করতে চাই। এতে খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন, পাশাপাশি ভোক্তারাও ভালো মানের পণ্য কেনার সুযোগ পাবেন।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে তাঁর এ উদ্যোগ থেকে মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা এবং বছরে তিন লাখ টাকার বেশি লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে খামারটি শতাধিক গরুতে উন্নীত করার পাশাপাশি আরও মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চান তিনি। রাজবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য ছড়িয়ে দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
কোমরপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, কাজী সাইফুল ইসলাম নিজের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের মাধ্যমে একটি সম্ভাবনাময় খামার গড়ে তুলেছেন। গরু পালনের পাশাপাশি দুধ থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করার উদ্যোগ অন্যদেরও উৎসাহিত করছে। তাঁদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারিত হলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং এলাকার দুগ্ধ খাত আরও বিকশিত হতে পারে।
কালুখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম রতন বলেন, শুধু তরল দুধ বিক্রি করে অনেক সময় খামারিদের প্রত্যাশিত লাভ করা কঠিন হয়। দুধ প্রক্রিয়াজাত করে মিষ্টি, দধি, ঘি ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করা গেলে বাড়তি মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হয়। কাজী সাইফুল ইসলাম একজন উদ্যোগী উদ্যোক্তা। তিনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী খামার পরিচালনা করছেন। তাঁর এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত দুধের ব্যবহার বাড়ানো, খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছেন কাজী সাইফুল ইসলাম। মানসম্মত পণ্য উৎপাদন, নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত ও ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে পারলে তাঁর এ উদ্যোগ রাজবাড়ীর দুগ্ধজাত পণ্যশিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
