
সোহেল রানা : রাজবাড়ী, মাগুরা ও ঝিনাইদহ তিন জেলার সীমান্তবর্তী পাংশা উপজেলার নাদুরিয়া, শৈলকুপা উপজেলার লাঙ্গলবাঁধ ও মাগুরা জেলার শ্রীপুর জিসি সড়কের গড়াই নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে ৬৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের পিএসসি গার্ডার সেতু। সেতুটি নির্মিত হলে রাজবাড়ী জেলা হয়ে ৭ জেলা ঝিনাইদহ, নড়াইল, যশোর, সাতক্ষীরা, মাগুরা, খুলনা ও রাজবাড়ীর মানুষের যোগাযোগের সুবিধা বৈপ্লবিক প্রসার ঘটবে। এ ছাড়া ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াতে এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে। সেতুটি চালু হলে এ জেলাগুলোর যাত্রীদের যাতায়াতে ৫০-৬০ কিলোমিটার পথ কমবে। সেই সাথে সময় ও অর্থ দুই-ই বাঁচবে মানুষের। তবে কাজের ধীরগতির কারণে হতাশা বাড়িয়েছে এ রুটে চলাচলকারী যাত্রীদের। ৩ দফা কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ ২০২০ সালের জুনে শুরু হলেও এ পর্যন্ত ৭৫ ভাগ শেষ হয়েছে। গত ১০ অক্টোবরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে। ৩ দফা মেয়াদ বাড়িয়েও ৬ বছরে সম্পন্ন করতে পারেনি।
রাজবাড়ী এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের তথ্যমতে, পল্লী সড়কে গুরুত্বপুর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্প (সিআইবিআরআর) প্রকল্পের আওতায় ৬৫০ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণকাজ ৬৩ কোটি ৯১ লক্ষ ৬৮ হাজার ১৭০ টাকা ব্যায়ে ২০২০ সালের ৩ জুন কাজ শুরু করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মীর হাবিবুল আলম (জেভি) এর এমএম বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ারিং। ২০২৩ সালের ৩ জুন কাজের মেয়াদ শেষ হয়। পরবর্তীতে ২ দফা কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়। ওই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় সর্বশেষ গত ১০ অক্টোবর সময়সীমা শেষ হলেও কাজ অসমাপ্ত রয়েছে।
নির্মাণ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সেতুটির চারটি স্প্যান ও দুটি গার্ডার বসানো বাঁকি রয়েছে। রাজবাড়ী প্রান্তে মাত্র তিনজন শ্রমিক কাজ করছিলেন। শ্রমিকসংকটের কারণে কাজের গতি কমেছে।
ইঞ্জিন চালিত খেয়া নৌকায় যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। পাশেই সেতু নির্মাণ কাজ চলছে। ৫-৬ জন শ্রমিক ধীরে ধীরে কাজ করছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মালামাল সরবরাহ না করায় কাজের ধীরগতি হচ্ছে। সেতুর পাশে এ্যাপোচ সড়ক নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ না করায় কাজ থমকে আছে।
নাদুরিয়া গ্রামের শিক্ষার্থী মোঃ আবদুল্লাহ জানায়, প্রতিদিন নৌকায় গড়াই নদী পার হয়ে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার লাঙ্গলবাঁধ উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাকে। সেতু নির্মাণের আশায় বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। ভেবেছিল, সেতু চালু হলে বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে মাত্র ১০ মিনিট লাগবে। কিন্তু তার স্কুলজীবন প্রায় শেষ হলেও সেতুর কাজ শেষ হয়নি।
লাঙ্গলবাঁধ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোঃ জাকিরুল ইসলাম বলেন, রাজবাড়ী থেকে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী তাঁর বিদ্যালয়ে পড়তে আসে। নদী পারাপারের সমস্যায় তারা নিয়মিত ক্লাস করতে পারে না। সেতু চালু হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে।
চলাচলরত যাত্রী ও স্থানীয়রা বলেন, কয়েক বছর ধরে এ সেতুটির কাজ চলছে। সেতুটি নির্মাণ কাজ শেষ হলে আমাদের এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যেতে ভেগান্তি কমবে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যেতে ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার পথ কমে যাবে। জরুরি প্রয়োজনে নদীর এপার থেকে ওপারে যেতে নৌকায় অনেক সময় লাগে। সেতুটি হলে অনেক সুবিধা হবে। সেতুটি চালু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। নতুন করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলার মধ্যকার বাণিজ্য প্রসার লাভ করবে। সেতুটি নির্মাণের ফলে আগামীতে এখানকার অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনা দেখছেন।
তারা বলছেন, এ সেতু বাস্তবায়ন হলে রাজবাড়ী, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, পাবনাসহ আরো বেশ কয়েকটি জেলা সরাসরি সুফল পাবে। এছাড়াও লাঙ্গলবাঁধের এ সেতুর মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষ সরাসরি তিন ধরনের সুবিধা পাবে। প্রথমত, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের অগ্রগতির সাথে সাথে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পরিবহন পথে সময় লাঘব হবে। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিকভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সম্ভাবনা আসবে। চারটি জেলার সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে। এতে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তার লাভ করবে। রাজবাড়ী-মাগুরায় একে অপরের বিনিয়োগ বাড়বে। এছাড়াও, রাজবাড়ীর কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। তাদের উৎপাদিত পচনশীল পণ্য সরাসরি খুলনা, মাগুরা ও অন্যান্য স্থানে পাঠাতে পারবেন। এতে পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যাবে।
তারা বলেন, এ সেতু চালু হওয়ার পর রাজবাড়ীর সাথে মাগুরা ও ঝিনাইদহের সরাসরি পরিবহনে যোগাযোগ হবে এ লাঙ্গলবাঁধ সড়ক দিয়ে। রাজবাড়ী থেকে মাগুরা যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় ট্রলার ঘাটের বিড়ম্বনা এড়াতে সিংহভাগ গাড়ির গন্তব্য হবে এ সেতু। এতে সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচবে। সেতু নির্মাণ কাজ চলমান থাকলেও ধীরগতি। কয়েকজন লোক দিয়ে এখানে কাজ করা হচ্ছে। এতে মনে হচ্ছে আরও কয়েক বছর লাগবে। আমরা দ্রুত সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করার দাবী জানাচ্ছি।
সেতুটি চালু হলে রাজবাড়ী, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলার মধ্যে যোগাযোগ সহজ হবে এবং স্থানীয় মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে দুর্ভোগ কমবে বলে আশা করছেন এলাকাবাসী।
নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক পিকুল হোসেন বলেন, নিয়মিত মজুরি না পাওয়ায় ১৫ জন শ্রমিকের মধ্যে ১২ জন কাজ ছেড়ে চলে গেছেন। গত চার মাস ধরে তাঁরাও মজুরি পাননি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আবদুল হামিদ বলেন, সেতুর কাজ শেষ করতে আরও এক বছর সময় লাগবে। সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।
রাজবাড়ী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মাহমুদ হাসান বলেন, সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতায় কাজের গতি কমেছে। জমি অধিগ্রহণের অনুমোদন পাওয়া গেছে। ক্ষতিপূরণ পরিশোধের পর সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করা যাবে। দ্রুত সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করার আশা করছেন তাঁরা।
