
মেহেদী হাসান : নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই রাজবাড়ীর পদ্মায় ইলিশ শিকার করছে শতশত জেলে। অনেকটা প্রকাশ্যেই চলছে ইলিশ শিকার ও বিক্রি। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে রাজবাড়ীর পদ্মাপারে প্রকাশ্যে চলছে ইলিশের কেনাবেচা। স্থানীয়রা মনে করছে জেলেদের সচেতন করা গেলে পদ্মায় আবার ফিরতে পারে রুপালী ইলিশের সুদিন। আর মৎস্য বিভাগ বলছে, অভিযান বাস্তবায়নে দিনে রাতে প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে বিভিন্ন ভাগে অভিযান অব্যাহত আছে। জেলেদের দেওয়া হয়েছে প্রনোদনার চাল।
ইলিশের প্রজনন রক্ষায় ৮ অক্টোবর থেকে টানা ২২ দিন ইলিশ ধরায়-পরিবহন ও মজুদ করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে সরকার। রাজবাড়ীর পদ্মায় নিশেধাজ্ঞার এই সময়ে দিনে ও রাতে প্রকাশ্যে চলছে ইলিশ ধরার প্রতিযোগিতা।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, এ জেলায় মোট নিবন্ধনকৃত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন। আর ইলিশ শিকারের সাথে জড়িত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৪০২ জন। এর মধ্যে থেকে ৫ হাজার ৫৯২ জন জেলেকে দেওয়া হয়েছে ২৫ কেজি করে চাল।
এদিকে মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে এখন পর্যন্ত ১১ দিনে রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে ৩৯ টি অভিযান ও ৭ টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় জব্দ করা হয়েছে ৬ লক্ষ ৫৫ হাজার মিটার এবং ১৪২ কেজি ইলিশ। ২২ জন জেলেকে আটকের পর ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল এবং ৮৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় ও ১০ জন জেলেকে নিয়মিত মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সেই সাথে নিলামের মাধ্যমে আয় হয়েছে ২১ হাজার টাকা। এরমধ্যে দৌলতদিয়া নৌ-পুলিশ প্রায় ৩ লক্ষ মিটার জাল ও ৫৭ কেজি ইলিশসহ আটক করেছে ১০ জন জেলেকে।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি ব্যাতিত জেলার ৪ উপজেলা রাজবাড়ী সদর, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দ পদ্মা নদী বেষ্টিত। এখানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন । এরমধ্যে ইলিশ মাছ শিকারের সাথে জরিত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৩০৪ জন থাকলেও বরাদ্দ সল্পতায় এবার সরকারী সহায়তার চাল পান নাই ৭১২ জন কার্ডধারী জেলে।
সরেজমিনে পদ্মা নদীর রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর, বাহাদুরপুর রতনদিয়া, মাহেন্দ্রপুর, জৌকুড়া, ধাওয়াপাড়া ঘাট, কালীতলা, নয়নসুখ, গোয়ালন্দ উপজেলার রাখালগাছি, দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম, পিয়ার আলীর মোড়, কলাবাগানসহ অন্তত অর্ধশত পয়েন্টে ঘুরে দেখাগেছে, বাঁধাহীনভাবে ইলিশ ধরায় ব্যস্ত জেলেরা।
এ সময় ধাওয়াপাড়া ঘাট এলাকার জেলে সুমন হোসেন বলেন, নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে কিছু জেলেকে প্রনোদনার চাল দেওয়া হলেও পায়নি প্রকৃত জেলেরা। যারাও পেয়েছে তাদের ওজনে দেওয়া হয়েছে কম। যে কারণে ইলিশ না ধরলে না খেয়ে থাকতে হবে তাদের, তাই নিষেধাজ্ঞা মানতে নারাজ জেলেরা।
জেলে খলিল মোল্লা বলেন, সরকারীভাবে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে ১৮ থেকে ১৯ কেজি। ৫ থেকে ৬ কেজি চুরি হয়েছে। কোন জেলেকে সঠিক ওজন দিয়ে চাল মেপে দেওয়া হয়নি। মাপা হয়েছে লাল রংয়ের বালতি দিয়ে, যে কারনে চুরি করা সহজ হয়েছে। এগুলোরও তদন্ত করে বিচার করা উচিৎ।
জেলে হারুন মোল্লা বলেন, সারা বছর রাজবাড়ীর পদ্মায় ইলিশ পাওয়া যায় না। শুধু এই মৌসুমে ডিম দিতে ইলিশ এ পদ্মায় আসে। তাই এ অঞ্চলের জেলেরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকে ইলিশ ধরার। তারা জানে নদীতে নামতে নিষেধাজ্ঞা আছে কিন্তুু ইলিশের লোভ সামাল দেওয়া কষ্ট তাই জেলেরা জেল ও জরিমানা জেনেও মাছ ধরতে নামে।
জেলে লুৎফর রহমান বলেন, রাজবাড়ীতে ইলিশ ধরার জেলে ৬ হাজার কিন্তুু এ মৌসুমে নদীতে জেলে হয়ে যায় অন্তত ২০ হাজার। কিছু লোক আছে ভ্যান চালায়, কিছু লোক আছে মুদি দোকান করে তারাও জাল কিনে নদীতে মাছ ধরতে যায়। পর্যাপ্ত প্রনোদনা আর আইনের কঠোর ব্যাবহার না হলে ইলিশ ধরা বন্ধ করা সম্ভব না।
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ইলিশ জাতীয় সম্পদ এই সম্পদ রক্ষা করতে হলে সকলকে সচেতন করতে হবে। মানুষ সচেতন হলে এবং ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ করলে আগামীতে ইলিশ পাওয়া যাবে পানির দরে। এ ব্যাপারে প্রশাসনকেই বেশি ভুমিকা রাখতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ইলিশ সম্পদ রক্ষা করতে হলে আগে বন্ধ করতে হবে কারেন্ট জাল। কারেন্ট জালের কারখানা বন্ধ করতে পারলে ইলিশ রক্ষা করা সম্ভব। যত্রতত্র কারেন্ট জাল পাওয়া যাওয়ার কারনে যে কেউ এই সময়ে জাল কিনে নদীতে নেমে পরে। আর জাল পাওয়া না গেলে কেউ নদীতে নামতে পারবে না। অন্যদিকে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা গেলেও সরকারী নিষেধাজ্ঞা মানানো সম্ভব হবে।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মাহাবুব উল হক বলেন, সারাদেশের ন্যায় রাজবাড়ীতেও ইলিশ রক্ষা অভিযান চলছে। এরই মধ্যে প্রায় এক লক্ষ্য মিটার কারেন্ট জাল জব্দ ও প্রায় একশত জেলেকে জেল জরিমানা করা হয়েছে। উদ্ধার করে বিপুল পরিমান ইলিশ মাছ এতিমখানায় প্রদান করা হয়েছে। রাজবাড়ীতে জেলা প্রশাসন-উপজেলা প্রশাসন ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে অভিযান চলমান আছে। আর তালিকাভুক্ত জেলেদের দেওয়া হয়েছে ২৫ কেজি করে চাল।
