কানুনগো হাবিবুল্লাহ’র পরিবারের সম্পদের তথ্য চেয়েছে দুদক

লেখক:
প্রকাশ: ৩ ঘন্টা আগে

স্টাফ রিপোর্টার : স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয় স্বজনের নামে শতকোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছিল রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কানুনগো পদে কর্মরত এসএম হাবিবুল্লাহর বিরুদ্ধে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে রাজবাড়ী, গাজীপুর, কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিপুল সম্পদের অভিযোগ নিয়ে ‘ভূমি অফিস হাবিবুল্লাহর টাকার খনি’ শিরোনামে ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত হয় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এবার তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ১৭ সেপ্টেম্বর দুর্ণীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়, রংপুর থেকে বালিয়াকান্দি উপজেলা ভূমি অফিস বরাবর এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে।
দুদকের চিঠিতে শুধু জমির তথ্য নয়, কোন কোন মৌজায় এসএম হাবিবুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে রেকর্ডভুক্ত অথবা নামজারিকৃত ভূমি রয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দালানকোঠা, স্থাপনা, প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি, ব্যবসায়িক স্পেস কিংবা অন্য কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এর বাইরে ইজারা সম্পত্তি, জলমহাল ও বালুমহালসহ বিভিন্ন ধরনের সম্পদের বিবরণ জানতে চেয়েছে কমিশন। দুদকের এ চিঠির মধ্য দিয়ে হাবিবুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের সম্পদের মালিকানা এবং বিস্তৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগের বিষয়টি সামনে এসেছে।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগের তথ্য অনুযায়ী, চাকরিজীবনে বিভিন্ন স্থানে পদায়নের সুবাদে ভূমি-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে নিজের এবং স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে হাবিবুল্লাহর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব সম্পদের আনুমানিক মূল্য শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। রাজধানীতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি এবং দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জমি ও প্লট থাকার তথ্যও ওই প্রতিবেদনে উঠে আসে।
হাবিবুল্লাহর স্ত্রী সাহিদা সুলতানার নামে রাজধানীর ১৫৯/১১ বিএল, মনিপুর এলাকায় ৭৮ লাখ ৬৬ হাজার টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং উত্তরা হাউজিং সোসাইটিতে আরও দুটি ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগ রয়েছে। ঢাকায় পরিবারের সদস্যদের চলাচলের জন্য ঢাকা মেট্রো গ-৩৪-৮১২৩ নম্বরের একটি গাড়ি এবং রংপুরে হাবিবুল্লাহর ব্যবহারের জন্য আরেকটি প্রাইভেট কার থাকার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁর ছেলের নামে ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল থাকার কথাও অভিযোগে বলা হয়।
অভিযোগে স্ত্রী ও সন্তানদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, হাবিবুল্লাহর আয়কর রিটার্নের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ২২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৩০ টাকা। একই সময়ে বেতন-ভাতাসহ বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছিল ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৯৬০ টাকা। এর বিপরীতে আয়কর প্রদান করেন ১০ হাজার ৫৮৬ টাকা। আয় ও সম্পদের এই হিসাবের সঙ্গে অভিযোগে উঠে আসা সম্পদের বিবরণ মিলিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
এসএম হাবিবুল্লাহর বাড়ি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মৃত আলহাজ ছালামত আলী শেখের ছেলে। অভিযোগ অনুযায়ী, বালিয়াকান্দি উপজেলা সদর ৪৭ নম্বর মৌজার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ এলাকা এবং ভাই ভাই ফিলিং স্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় তাঁর নিজের, স্ত্রী সাহিদা সুলতানা, দুই ছেলে হাসিবুল হাসান ও রাকিবুল হাসান এবং শালিকা হামিদা পারভীনের নামে মূল্যবান জমি রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় ব্যক্তি খন্দকার হাসান তারেকের কাছ থেকে ৬৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকার জমি কেনেন হাবিবুল্লাহ। এর মধ্যে ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদ এবং বাকি ৩৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা গত ১২ ফেব্রুয়ারি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের মিরপুর শাখায় নিজের হিসাব থেকে চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া বালিয়াকান্দি শহরে ১২ শতক জমির ওপর একতলা ভবন, বহরপুর ইউনিয়নের রায়পুর মৌজায় প্রায় ১০ একর কৃষিজমি, ইলিশকোল মৌজায় মার্কেটের একাধিক পজিশন ও কৃষিজমি থাকার অভিযোগ রয়েছে। বালিয়াকান্দি বাসস্ট্যান্ড এবং সরকারি কলেজ-সংলগ্ন এলাকাতেও তাঁর কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বহরপুর ইউনিয়নের রায়পুর, ইলিশকোল, বালিয়াকান্দি সদর ও পাইককান্দি মৌজায় এক বছরে ১৭টি দলিলে নিজের, স্ত্রী ও সন্তানদের নামে কয়েক একর ভিটা সম্পত্তি কেনা হয়েছে। এ ছাড়া বাড়িতে ৩১টি গরুর একটি খামার রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা। ঢাকা, কেরানীগঞ্জ, কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ২০ কোটি টাকার প্লট থাকার দাবিও করা হয়।
হাবিবুল্লাহর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এর আগেও দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। সর্বশেষ গত ১০ জুন দুদক চেয়ারম্যান বরাবর ঢাকায় কমিশনের কার্যালয়ে মোঃ জিল্লুল রহমান নামে এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে বলা হয়, হাবিবুল্লাহ জ্ঞাত আয়বহির্ভূতভাবে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অভিযোগকারীর দাবি, বালিয়াকান্দি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, বহরপুর ভূমি অফিস ও বালিয়াকান্দি ভূমি অফিস থেকে হাবিবুল্লাহ এবং তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হবে। ভূমি পরিদর্শন, খাসজমি বরাদ্দে মতামত ও তদন্তসহ বিভিন্ন কাজে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও তোলা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্ত সাপেক্ষ।
হাবিবুল্লাহ ১৯৮৩ সালে রাজবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৮৯ সালে রাজবাড়ী কালেক্টরেটে সহকারী তহশিলদার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। পরে তহশিলদার এবং এরপর কানুনগো পদে পদোন্নতি পান। তাঁর চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ছিলেন।
স্থানীয়রা বলেন, হাবিবুল্লাহর জমি কেনার নেশা রয়েছে। আয়ের তুলনায় অনেক বেশি জমি কেনা হয়েছে। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।