প্রতিবন্ধী কোরমানের ছেলে-মেয়ের বিসিএস অফিসার বানানোর স্বপ্ন পুরণ করতে চান স্ত্রী

লেখক:
প্রকাশ: ২ মাস আগে

সোহেল রানা : ২০ বছর আগের কথা। দরিদ্র কোরমান শেখের ঘরে জন্ম নেয় দু সন্তান। এদের নিয়েই দরিদ্র পিতার স্বপ্ন। স্বপ্ন-ছেলেকে বিসিএস ক্যাডার বানাবেন আর মেয়েকে বানাবেন ব্যাংকার। স্বপ্ন বিলাসী দরিদ্র কোরমান এ স্বপ্ন বুকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমান ঢাকার সাভারে। কাজ নেন মুরগী বেঁচাকেনার দোকানে। এক পর্যায়ে নিজেই গড়ে তোলেন মুরগী বেঁচাকেনার ব্যবসা। ছেলে মেয়েদের ভর্তি করে স্থানীয় স্কুলে। মোটামুটি চলে যাচ্ছিল কোরমান শেখের জীবন। সম্প্রতি বেশ টানাপোড়নও লেগে থাকতো। কারণ দরিদ্র কোরমান ছিলো ছোট বেলা থেকেই প্রতিবন্ধী। সে মুরগীর ব্যবসা ছাড়া অন্য কাজ করতে সক্ষম ছিলো না। ছেলে ও মেয়ে এখন ভার্সিটি পড়ুয়া। তার বড় ছেলে সাভারের শুকুরজান উচ্চ বিদ্যালয় ও সাভার ক্যান্টরমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে পড়ালেখা সম্পন্ন করে এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। মেয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়নরত। এ জন্য বেশ খরচ জোগার করতে হয় কোরমান শেখের। কিন্তু সন্তাদের এসব বুঝতে দেয়না কোরমান শেখ। তাই রাতদিন পরিশ্রম করে। ছেলে মেয়েদের সামনে রেখে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখে, নিজের কর্মের অবসর নেওয়ার স্বপ্ন দেখে।
গত ২০ জুলাই বেলা ১২ টা। কোরমান শেখের শরীরটা ভালো ছিলো না। ছেলে মেয়েরা বাবাকে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ঘর থেকে বের হন কোরমান। দোকানের মাল আনতে হবে, তাই তার সর্ব সম্বল ১ লক্ষ টাকাও সঙ্গে নিয়ে যায়। অসুস্থ শরীর নিয়ে, অতিকষ্টে খুড়িয়ে খুড়িয়ে দোকানে আসেন। আশপাশের আরো ১২-১৩ টি দোকান খোলা ছিলো। এরই মাঝে মেয়ে মিতু আক্তার ফোন দেয়, বাবা বাড়ী ফিরে আসো। কারফিউ ঘোষণা হয়েছে। এ পাশ থেকেও উত্তর মা আসছি। তারপরই পুলিশের বাঁশির শব্দ। যে যার মতো পালাতে থাকে। কোরমান শেখসহ ১৩ জন মুরগী ব্যবসায়ী পালায় বরফ কলে। ৩ ব্যবসায়ী পালায় মসজিদের সিড়ির নিচে। এসময় একদল দূর্বত্ত বরফ কলের দরজা ভেঙ্গে ফেলে। তারা প্রথমে কোরমান শেখকে ধরে। এসময় কোরমান হাত জোর করে কাকুতী মিনতী করে বলে আমি প্রতিবন্ধী, এখানে মুরগীর ব্যবসা করি। আমাকে ছেড়ে দিন। ঘরে আমার সন্তানেরা আমার অপেক্ষায় আছে। পায়ে ধরি আপনাদের। ওরা কিছুই না শুনে বুকে বন্ধুক লাগিয়ে গুলি করে কোরমানকে। অন্যদেরও গুলি করে চলে যায়। যাবার সময় কোরমানের টাকার ব্যাগটাও নিয়ে যায় হত্যাকারীরা। এভাবেই হায়েনারা ভেঙ্গে দেয় কোরমান শেখের স্বপ্নের বাতিঘর, হাহাকার এনে দেয় এক স্বপ্ন বিলাসী বাবার পরিবারে।
হায়েনাদের বুলেটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন কোরবান শেখ (৪৯)। তিনি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া গ্রামের মৃত মেহের শেখের ছেলে। ৭ ভাই বোনের মধ্যে কোরমান সবার ছোট। তাই সবাই তাকে বেশি আদর করতো।
২০ জুলাই রাত ১১ টায় হাজারো মানুষের সমাগমে রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বাগপাড়া কেন্দ্রীয় গোরস্থানে কোরমান শেখের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয় ।
নিহত কোরমান সেখের মেয়ে মিতু আক্তার মিতা বলেন, গুলির শব্দ শুনে দুপুরের দিকে মায়ের নির্দেশে বাবাকে ফোন দিয়ে বাসায় আসতে বলি। বাবা এলো ঠিকই কিন্তু লাশ হয়ে। আমিতো চাইনি আমার বাবা লাশ হয়ে ফিরে আসুক। বাবা ছাড়া এখন আমরা কিভাবে বাঁচব? আমাদের বেঁচে থাকার দায়িত্বটাই বা কে নেবে। সরকারের কাছে আমি আমার বাবার হত্যাকারীর বিচার চাই।
কোরমান সেখের ছেলে রমজান সেখ বলেন, আমার বাবা আমাকে সামান্য মুরগির ব্যবসা করে কত কষ্ট করে আমার বোন আর আমাকে লেখাপড়া করাচ্ছিলেন। আমার বাবাকে গুলি করে হত্যা করা হলো। বাবাকে এভাবে হত্যা করা হবে সেটা কখনো ভাবিনি। আমার মা-বোনকে এখনকে দেখাশোনা করবে। আমার ও আমার বোনের লেখাপড়া করার দায়িত্বটা কে নেবে?
স্বামীকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছে রমজানের স্ত্রী শিল্পী খাতুন বলেন, “ছেলে ও মেয়েকে বিসিএস ক্যাডার করার স্বপ্ন নিয়ে তাদের দুজনকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে নিজের ছোট্ট ব্যবসা মুরগির দোকান করে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন স্বামী। কিন্তু আমার স্বামীকে গুলি করে কেন হত্যা করা হলো।’
শিল্পী আক্তার বলেন, গত ১৭-১৮ বছর ধরে আমার স্বামী ঢাকার সাভারে মুরগির ব্যবসা করতেন। গত ২০ জুলাই দুপুর ১টার দিকে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবীতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে পড়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ওই রাত ১১টার দিকে তার নিজ বাড়ি কালুখালী উপজেলার বাগমারা গ্রামে কেন্দ্রীয় গোরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।
স্ত্রী শিল্পী আক্তার আরও বলেন, আমার প্রতিবন্ধী স্বামীকে যারা গুলি করে হত্যা করল, আমি তাদের বিচার চাই।
তিনি বলেন, জুলাই ফাউন্ডেশন, জেলা প্রশাসন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন-অর রশীদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সহ বিভিন্ন সহযোগিতা পেয়েছি। এখন ছেলে-মেয়ের চাকুরী, চাঁদপুর চত্বরকে কোরবান চত্বর ও সড়কের নামকরণের দাবী জানান।