নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের রায় : বালিয়াকান্দিতে মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে পাষণ্ড বাবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

লেখক:
প্রকাশ: ৮ ঘন্টা আগে

সোহেল রানা : রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে পাষন্ড পিতা শহিদুল ইসলামকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড, অনাদায়ে আরও ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। সোমবার দুপুর ১টায় রাজবাড়ী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোঃ তহিদুল ইসলাম এ রায় দেন। দন্ডিত শহিদুল ইসলাম জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের পাকালিয়া গ্রামের মৃত মকছেদ ফকিরের ছেলে। রায় ঘোষণার সময় আসামী আদালতে উপস্থিত ছিল না।
মামলার অভিযোগে প্রকাশ, শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে তার মেয়েকে (১৬) ধর্ষণের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯(১) ধারায় রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি থানায় গত ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারী মামলা দায়ের করেন স্ত্রী।
এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, গত ২০২১ সালের ২৮ ডিসেম্বর রাত ১১ টার সময় তার শয়নকক্ষে ঘুম থেকে জেগে তার মেয়ের সাথে তার স্বামী শহিদুল ইসলামকে ধস্তাধস্তি করতে দেখেন। ওই সময় তিনি তার স্বামী শহিদুল ইসলামকে বাঁধা প্রদান করেন। ধর্ষণে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে শহিদুল ইসলাম তাকে ও তার মেয়েকে বিভিন্ন ধরণের হুমকি প্রদান করেন এবং মারধর করে বাড়ী থেকে বের করে দেন।
মেয়ের কাছে জানতে পারেন, শহিদুল ইসলাম এক বছর যাবত বিভিন্ন সময়ে তার মেয়েকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। তার মাকে আরও জানায়, গত ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর রাত ১ টার সময় তার মায়ের অনুপস্থিতিতে শহিদুল ইসলাম তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। বিষয়টি নিকট আত্মীয়-স্বজনের সাথে আলোচনা করে বালিয়াকান্দি থানায় মামলা দায়ের করেন।
ওই মেয়ে আদালতে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কায়ছুন্নাহার সুরমার কাছে ঘটনার বিবরণ দিয়ে জবানবন্দী প্রদান করেন। মেডিকেল পরীক্ষায় ধর্ষণ প্রমাণিত হয়। মামলাটি প্রথমে বালিয়াকান্দি থানার সাব-ইন্সপেক্টর আব্দুল মতিন তদন্ত করেন। তার বদলীর পরে থানার সাব-ইন্সপেক্টর আসাদুজ্জামান রিপন তদন্তভার প্রাপ্ত হন এবং তিনি তদন্ত শেষে শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯(১) ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মোট ৯ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদান করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত মৌখিক, পারিপার্শ্বিক, অবস্থাগত ও মেডিকেল সাক্ষ্য একত্রে পর্যালোচনায় আসামী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে তার মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলা যায়। মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামী শহিদুল ইসলাম সাজা পাওয়ার অধিকারী মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ধর্ষণ এমন একটি অপরাধ, যা ভিকটিমের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি ছাড়াও তার পারিবারিক, সামাজিক ও মানবিক মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন করে। এ মামলার ভিকটিম বাড়ীতে তার নিজের পাষন্ড বাবার কাছে ধর্ষিত হয়েছেন। একটি মেয়ের কাছে তার বাবা পরম মমতায় নির্ভরতার আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ মামলার ঘটনায় তার উল্টোটি ঘটেছে, যা স্বাভাবিক মানব সভ্যতার জন্য এক কলঙ্কজনক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পি.পি) জাহিদ উদ্দিন মোল্লা বলেন, আসামী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯(১) ধারার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ওই ধারার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এ অপরাধের দায়ে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড ও ৫ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়।
এ মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ১৫ ধারার বিধান অনুযায়ী আসামী শহিদুল ইসলামের প্রতি আরোপিত অর্থদন্ড ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষতিপূরণের টাকা আসামী শহিদুল ইসলামের বর্তমান সম্পদ হতে আদায় করা সম্ভব না হলে তিনি ভবিষ্যতে যে সম্পদের মালিক বা অধিকারী হবেন সে সম্পদ হতে আদায়যোগ্য হবে এবং এ ক্ষেত্রে উক্ত সম্পদের উপর অন্যান্য দাবী অপেক্ষা ক্ষতিপূরণের দাবী প্রাধান্য পাবে।
তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ১৬ ধারার বিধান অনুযায়ী কালেক্টর, রাজবাড়ীকে আসামী শহিদুল ইসলামের স্থাবর বা অস্থাবর বা উভয় প্রকার সম্পদ নিলামে বিক্রয় করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ এ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়। ক্ষতিপূরণের অর্থ এ ট্রাইব্যুনালে জমা হওয়া সাপেক্ষে তা ভিকটিমকে প্রদান করা হবে।