বিজেআরআই-৯ এ ঝুকছে কৃষক : ভালো দাম পাওয়ায় পাট চাষে ফিরছে রাজবাড়ীর চাষীরা

লেখক:
প্রকাশ: ৪ দিন আগে

মেহেদী হাসান : সোনালী আঁশের সুনামের জেলা রাজবাড়ী। এ জেলায় এক সময় সবচেয়ে বেশি জমিতে পাটের আবাদ করতো চাষীরা। কৃষি উপকরণ, সার, কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকসান গুনার কারণে মাঝে পাট চাষ কিছুটা কমলেও আবারো পাট চাষেই ঝুঁকছেন এ জেলার পাট চাষীরা। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবছর রাজবাড়ীতে গত বছরের চেয়ে ৫০৪ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে রাজবাড়ীতে ৪৯ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিলো আর উৎপাদন হয়েছিলো ৯৭ হাজার ৬১৪ মেট্টিক টন পাট। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে রাজবাড়ীতে ৪৭ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিলো আর উৎপাদন হয়েছিলো ৬৯ হাজার ৯০৩ মেট্টিক টন পাট। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে রাজবাড়ীতে ৪৭ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল আর উৎপাদন হয়েছিলো ১ লক্ষ ১ হাজার ৪২৪ মেট্টিক টন পাট। ২০২০-২১ অর্থ বছরে রাজবাড়ীতে ৪৬ হাজার ৪৮৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিলো আর উৎপাদৎন হয়েছিলো ৮৬ হাজার ১১৫ মেট্টিক টন পাট। ২০২১-২২ অর্থ বছরে রাজবাড়ীতে ৪৮ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিলো আর উৎপাদন হয়েছিলো ১ লক্ষ্য ৯ হাজার ৮৯৪ মেট্টিক টন পাট। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে রাজবাড়ীতে ৪৯ হাজার ৮২২ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিলো আর উৎপাদন হয়েছিলো ১ লক্ষ ১২ হাজার ২২৪ মেট্টিক টন পাট। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রাজবাড়ীতে ৪৯ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিলো আর উৎপাদৎন হয়েছিলো ১ লক্ষ ৮ হাজার ৭৯৩ মেট্টিক টন পাট। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে রাজবাড়ীতে ৪৬ হাজার ১৫৮ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিলো আর উৎপাদন হয়েছিলো ১ লক্ষ ১০ মেট্টিক টন পাট। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে রাজবাড়ীতে ৪৭ হাজার ২৭৬ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিলো আর উৎপাদন হয়েছিলো ৯৯ হাজার ৫৪৪ মেট্টিক টন পাট। আর সর্বশেষ ২০২২৬-২৭ অর্থ বছরে রাজবাড়ীতে ৪৭ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিলো আর উৎপাদন হয়েছিলো ১ লক্ষ ৩ হাজার ৫০৭ মেট্টিক টন পাট। এ বছর রাজবাড়ী জেলায় ২ হাজার পাট চাষীর মধ্যে ১ কেজি করে পাটের বীজ ও ৫ কেজি ডিএপি ও ৫ কেজি করে এমওপি সার প্রনোদনা হিসেবে প্রদান করেছে।
রবিবার সকালে রাজবাড়ীর খানখানাপুরে পাটের আড়তে গিয়ে দেখাযায়, কৃষকেরা পাট বিক্রি করে খুবই ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। এ বাজারে পাটের রং আশ ও সাইজ ভেদে ৩ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা মন পাট বিক্রি হচ্ছে।
এ সময় খানখানাপুর এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে এক বিঘা (৩৪ শতাংশ) জমিতে পাট চাষ করতে কম করে হলেও ১৫ হাজার টাকা খরচ পরে। এক বিঘা জমিতে অন্তত ৭ মন পাট উৎপাদন হয়। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী অন্তত ২৮ হাজার টাকা বিক্রি করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে বলাই যায় পাট চাষে বর্তমানে দ্বিগুন লাভ। তাই কৃষকেরা আবার পাট চাষে ফিরছে।
কৃষক আলী আজগর হোসেন বলেন, পাট চাষে নানান ধরনের সমস্যা রয়েছে, প্রচন্ড গরম পরলে পাট বেরে উঠেনা। আবার পাট ক্ষেতে বিছাপোকার আক্রমন বাড়ে। আবার সেচ দিতে গিয়ে ডাবল টাকা খরচ হয়ে যায়। আর এ বছর তেলের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে সামনে কৃষি পন্যর উৎপাদন খরচ আরো বেড়ে যাবে। এতে কৃষক বেশি বিপদে পড়বে।
পাট চাষী শুভ কুমার বৈদ্য বলেন, মেশিনে সেচ দিয়ে পাট চাষ করতে গিয়ে বিঘা প্রতি অন্তত ২ হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। এবছর তা আরো বাড়বে। আবার সার ও কীটনাশকের দাম অনেক বেশি। যে কারণে সামনে দিনগুলোতে লোকসানের আশঙ্কা করছে তারা।
কৃষক ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, এক বিঘা জমির পাট আবাদ করতে প্রতি বছর ১২ হাজার টাকা থেকে ১৩ হাজার খরচ হলেও এ বছর বাড়তি সেচ দিতে হয়েছে যে কারণে খরচ হয়েছে বিঘা প্রতি ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। তবে বাজারে দামভালো থাকার কারণে কৃষক একটু লাভের মুখ দেখছে।
কৃষক নিতাই চন্দ্র রায় বলেন, রাজবাড়ীতে বর্তমানে তিন জাতের পাটের বেশি আবাদ হয়। বিজেআরআই-৯ বিজেআরআই-৮ ও জেআরও ৫২৪। এই ধরনের মধ্যে বিজেআরআই-৯ জাতের পাটে কৃষকের লাভ বেশি। মাত্র ১১০ দিনে পাট কাটা সম্ভব হয়। আবাদ লম্বা ও পাটের রং সোনালী হওয়ায় এর চাহিদা ও দাম বেশি। আর বিজে আরআই ৮ পাটটি কাটতে সময় লাগে অন্তত ১৩৪ দিন। এ জাতের পাট চাষ করলে আবাদ আমন চাষে পিছিয়ে যেতে হয়। আর জেআরও ৫২৪ এটা ভারতীয় বীজ। উৎপাদন মোটামুটি তাই এটা তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, রাজবাড়ীতে শস্যবিন্যাস মূলত তিন ধরনের পেয়াজ,পাট ও রোপা আমন। অক্টোবরের ১৫ তারিখ থেকে মার্চের ১৫ তারিখ পর্যন্ত রবি মৌসুমে এ জেলার চাষীরা পেয়াজ চাষ করে। ১৩এপ্রিলের মধ্যে পাট চাষ করলে পাটের গ্রোথ ভালো হয়। এর ১১০ থেকে ১১৫ দিনের মধ্যে পাট কাটা শেষ হলেই রোপা আমন চাষ শুরু হয়। যে জেলাগুলোতে রোদ ও বৃষ্টি পাশাপাশি থাকে সেই জেলাগুলো পাট চাষ ভালো হয়। রাজবাড়ীর মাটিও পাট চাষের উপযোগি। চাষ বাড়া কমাটা দামের উপর নির্ভর করে। যে বছর দাম ভালো থাকে কৃষক সে বছর চাষ বেশি করে।
রাজবাড়ীতে দুই আছে আগে পাট চাষ কমলেও আবার দাম বাড়ার কারনে পাট চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া মাঠ পর্যায়ে উপ সহকারী কর্মকর্তারা সব সময় কৃষকের খোজ নিচ্ছেন বলে দাবী করেন তিনি।