
স্টাফ রিপোর্টার : একসময় গ্রামে শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই ছিল ঢাকঢোলের শব্দ, পূজামণ্ডপে মানুষের ভিড় আর রাতভর যাত্রাপালার আসর। বাঁশের মঞ্চ, চারপাশে হ্যাজাক বাতির আলো, মাটিতে খড় বিছিয়ে নারী-পুরুষের একসঙ্গে বসে যাত্রা উপভোগ, এসবই ছিল গ্রামীণ দুর্গোৎসবের চিরচেনা অনুষঙ্গ। পূজার কয়েক দিন ধরে চলতো যাত্রাপালা। কোথাও কোথাও বসতো সপ্তাহব্যাপী আসর। হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠান ঘিরে তৈরি হতো সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মিলনমেলার পরিবেশ।
বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে রাজবাড়ীর গ্রামাঞ্চলে দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ ছিল যাত্রাপালা। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত। আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের বিস্তারে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ যাত্রাশিল্পের ঐতিহ্য। উচ্চ শব্দের সাউন্ড বক্স আর বাহারি আলোকসজ্জার ভিড়ে ম্লান হয়ে গেছে একসময়কার জনপ্রিয় এই সাংস্কৃতিক আয়োজন। যেসব পূজামণ্ডপে রাতভর যাত্রার আসর বসতো, সেখানে এখন আর শোনা যায় না সেই সংলাপ, গান কিংবা দর্শকদের করতালি।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের প্রেমটিয়া গ্রামের শিকদার ও সেন বাড়ির দুর্গাপূজা ছিল যাত্রাপালাকেন্দ্রিক এমনই এক ঐতিহ্যের ধারক। শিকদার বাড়িতে প্রায় সাত দশক ধরে পারিবারিকভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে সেন বাড়িতে প্রায় চার দশক ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সর্বজনীন দুর্গাপূজা। একসময় এই দুই বাড়ির পূজার অন্যতম আকর্ষণ ছিল যাত্রাপালা। শিকদার বাড়িতে প্রায় ১০ বছর আগেও সর্বশেষ যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়েছিল।
এসব যাত্রাপালার আয়োজন কোনও একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রামের হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলে নিতেন আয়োজনের দায়িত্ব। কেউ অর্থ সংগ্রহ করতেন, কেউ তৈরি করতেন মঞ্চ, আবার কেউ যুক্ত হতেন অভিনয়ে। অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন শ্রমজীবী মানুষ, স্থানীয় ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও স্কুলশিক্ষক। পেশাদার অভিনয়ের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না। আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তারা হয়ে উঠেছিলেন এলাকার পরিচিত মুখ। নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অবশ্য ভাড়া করে আনা হতো পেশাদার যাত্রাশিল্পীদের।
পূজার দুই থেকে তিন মাস আগে থেকেই শুরু হতো যাত্রাপালা নির্বাচনের কাজ। এরপর চলত নিয়মিত মহড়া। গ্রামের মানুষ নিজেরাই তৈরি করতেন মঞ্চ। অভিনয়শিল্পীদের পোশাকও সংগ্রহ করতে হতো নিজেদের উদ্যোগে। আয়োজনের খরচ জোগাতে চলত গণচাঁদা সংগ্রহ। কখনো গ্রামের হাটে, কখনো দোকানে দোকানে গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা হতো। মঞ্চের চারপাশে জ্বালানো হতো হ্যাজাক বাতি। মাটিতে খড় বিছিয়ে বসতেন দর্শকেরা। রাতভর অভিনয়, গান ও সংলাপের মধ্য দিয়ে মঞ্চে ফুটে উঠতো নানা গল্প।
‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘গলি থেকে রাজপথ’, ‘মা মাটি মানুষ’, ‘বেদের মেয়ে জোছনা’, ‘জেল থেকে বলছি’, ‘বিদ্রোহী বধূ’ ও ‘ভাইয়ের রক্তে ভাইফোঁটা’র মতো জনপ্রিয় যাত্রাপালা দর্শকদের আকৃষ্ট করত। এসব পালা দেখতে দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আসতেন। কখনো যাত্রাপালার আয়োজনের কারণে দশমীর পর প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হতো। যাত্রাকে কেন্দ্র করে বসত মেলাও।
সরিষা প্রেমটিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম নব্বইয়ের দশকের সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘তখন এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, কিন্তু মানুষের মন ছিল উদার। গ্রামের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও আন্তরিকতা ছিল। দুর্গাপূজার যাত্রাপালা ছিল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম—সবাই একসঙ্গে বসে যাত্রা দেখতেন। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন সবাই।’
তিনি বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে বিনোদনের ধরন বদলেছে, মানুষের জীবনযাপনেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এর সঙ্গে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও পারস্পরিক মেলবন্ধনের জায়গাটিও সংকুচিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত নয়। ফলে এক প্রজন্মের সঙ্গে আগের প্রজন্মের সাংস্কৃতিক সংযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে।’
গ্রামের কাপড় ব্যবসায়ী নিতাই চক্রবর্তী একসময় যাত্রাপালায় নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতেন। পেশাদার অভিনেতা না হয়েও অভিনয়ের সুবাদে এলাকায় পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। পুরোনো দিনের কথা বলতে গিয়ে নিতাই চক্রবর্তী বলেন, ‘আমাদের সময়ে বিনোদনের এত মাধ্যম ছিল না। তাই গ্রামের মানুষ নিজেরাই বিনোদনের আয়োজন করতাম। যাত্রাপালাকে ঘিরে সবার মধ্যে একটা আন্তরিকতা তৈরি হতো। কে কোন ধর্মের, কে কী করেন—এসব বড় হয়ে উঠত না। সবাই মিলে আয়োজন করতাম, একসঙ্গে আনন্দ করতাম। সেই সময়ের সামাজিক বন্ধন আর উৎসবের আনন্দ এখন আর আগের মতো দেখা যায় না।’
পেশায় মুহুরি রশিদ শেখেরও দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা ছিল এলাকার যাত্রাপালার সঙ্গে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি যাত্রা ও নাটকের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর ভাষ্য, শুধু দুর্গাপূজা নয়, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও শহীদ দিবসেও এলাকায় যাত্রাপালার আয়োজন করা হতো।
রশিদ শেখ বলেন, ‘আগে মানুষ একসঙ্গে চলতে ও মিলেমিশে থাকতে পছন্দ করত। যাত্রাপালা ছিল এক হওয়ার একটা উপলক্ষ। সবাই মিলে আয়োজন করতাম, সবাই মিলে দেখতাম। এখন নতুন প্রজন্মের বিনোদনের বড় জায়গা হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। পাশাপাশি আগের মতো সম্মিলিত উদ্যোগও দেখা যায় না। ফলে গ্রাম থেকে যাত্রাপালার সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে।’
সেন বাড়ির পূজার সঙ্গে যাত্রাপালার দীর্ঘদিনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে কাজল সেনের। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে একসময় টানা এক সপ্তাহ যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গ্রামের মানুষই অভিনয় করতেন। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ যাত্রা দেখতে আসতেন। কখনো দশমীর পর প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হতো, যাত্রাকে কেন্দ্র করে মেলাও বসত। তখন যাত্রাপালা ছিল গ্রামের মানুষের অন্যতম বিনোদন। নব্বইয়ের দশককে এই আয়োজনের স্বর্ণযুগ বলা যায়।’
কাজল সেন আরও বলেন, ‘যাত্রা দেখতে কোনো টিকিট লাগত না। নারী-পুরুষ সারারাত বসে যাত্রা উপভোগ করতেন। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন, রাত করে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু তখনকার অনেক অভিনেতা আর বেঁচে নেই। নতুন করে আয়োজন করার মতো উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছে না। তার ওপর যাত্রাপালা করতে গেলে প্রশাসনের বিভিন্ন অনুমতি ও নানা আনুষ্ঠানিকতা সামলাতে হয়। সব মিলিয়ে আগের মতো আয়োজন আর হয়ে ওঠে না। তাই দুর্গাপূজায় যাত্রাপালার সেই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে গেছে।’
সরিষা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও পাংশা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহম্মদ হোসেন নিজেও একসময় যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন। তিনি বলেন, যাত্রাপালা শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, সামাজিক সম্প্রীতি ধরে রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ ছিল।
আহম্মদ হোসেন বলেন, ‘আগে মানুষের মধ্যে এত বিভেদ ছিল না, দলাদলিও ছিল কম। পূজায় যাত্রাপালা হতো, গান হতো। আমরা সবাই মিলে সেই আয়োজন করতাম, একসঙ্গে আনন্দ করতাম। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে মানুষ উৎসবে অংশ নিত। সময়ের সঙ্গে সেই পরিবেশ বদলে গেছে। গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক উপাদান হারিয়ে যাচ্ছে। যাত্রাপালার মতো ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
প্রেমটিয়ার শিকদার ও সেন বাড়ির দুর্গাপূজায় এখন আর আগের মতো যাত্রাপালার আয়োজন হয় না। বদলে গেছে উৎসবের আয়োজন, পরিবর্তন এসেছে বিনোদনের ধরনেও। তবে প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত হ্যাজাক বাতির আলোয় আলোকিত সেই মঞ্চ, গ্রামের মানুষের অভিনয়, রাতভর দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে একসঙ্গে আনন্দ করার দিনগুলো।
যাত্রাপালা হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও। প্রবীণদের প্রত্যাশা, নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে স্থানীয় উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা বাড়বে। ফিরে আসবে এমন সাংস্কৃতিক আয়োজন, যেখানে বিনোদনের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে গড়ে উঠবে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক মেলবন্ধন।
