বালিয়াকান্দিতে ছোট ভাইকে আইনী খাতায় অদৃশ্য দেখিয়ে সম্পত্তি আত্নসাতের চেষ্টা

লেখক:
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

স্টাফ রিপোর্টার : জীবিত আপন ছোট ভাইকে নিজের নামের ‘অন্য রূপ’ বানিয়ে পৈতৃক ও ক্রয়কৃত সমস্ত সম্পত্তি একাই গ্রাস করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন বড় ভাই। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এক নামের প্রত্যয়নপত্র আর আদালত থেকে কৌশলে এফিডেভিট বানিয়ে গুটিয়ে এনেছিলেন সব আয়োজন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সতর্কতায় ধরা পড়েছে এ চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি। ঘটনাটি ঘটেছে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের বাঁধুলী খালকুলা গ্রামে।
অভিযোগ সূত্রে দেখা গেছে, মোঃ সুজন শেখ (আজাদ) ও মোঃ আছাদ শেখ দুই আপন ভাই। তাদের পিতা ওহাব শেখের মৃত্যুর পর দুই ভাই, দুই বোন এবং দুই মা আইনগতভাবে পৈতৃক সম্পত্তির বৈধ ওয়ারিশ হন। কিন্তু পরিবারের বড় ভাই মোঃ আছাদ শেখ এ ওয়ারিশি বণ্টন মানতে নারাজ। ছোট ভাই সুজন শেখের পৈতৃক অংশ এবং তার নিজ নামে কেনা জমি আত্মসাৎ করতে অভিনব জালিয়াতির আশ্রয় নেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোঃ আছাদ শেখ প্রথমে স্থানীয় জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করেন। যেখানে দাবি করা হয় মোঃ আছাদ শেখ, মোঃ আজাদ শেখ এবং মোঃ আহাদ শেখ একই ব্যক্তি। পরবর্তীতে এ প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে রাজবাড়ী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নিজের একাধিক নামের মিথ্যা ঘোষণার একটি এফিডেভিট (হলফনামা) সম্পাদন করেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল, ছোট ভাই সুজন শেখ (আজাদ) কে আইনি খাতায় অদৃশ্য করে সব জমি নিজের নামে নামজারি (মিউটেশন) করিয়ে নেওয়া।
কৌশলে ছোট ভাই সুজন শেখ (আজাদ) – এর নামে থাকা দলিলের সম্পত্তি নিজের নামে নামজারির আবেদনও করে বসেন আছাদ শেখ। তবে বিষয়টি বিভিন্ন মারফতে টের পেয়ে যান ভুক্তভোগী সুজন শেখ (আজাদ)। গত এপ্রিল মাসে তিনি জালিয়াতির এ পাঁচতারা পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে বালিয়াকান্দি সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর নামজারি স্থগিতের আবেদন জানান। এরই মধ্যে প্রত্যয়নপত্র বাতিল করেছে সংশ্লিষ্ট জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান খাইরুল ইসলাম।
অভিযোগের ভিত্তিতে সাবেক বালিয়াকান্দি সহকারী কমিশনার (ভূমি) এহসানুল হক শিপন ঘটনাটির গভীর তদন্ত শুরু করেন। ভুক্তভোগীর মা, নিকট আত্মীয়স্বজন, ইউনিয়ন পরিষদের মূল ওয়ারিশ সনদ এবং প্রয়োজনীয় দলিলপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর বেড়িয়ে আসে আসল সত্য। তদন্তে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আজাদ শেখ ও আছাদ শেখ মোটেই এক ব্যক্তি নন, বরং তারা সহোদর ভাই। ভুক্তভোগী সুজন শেখের ডাকনাম আজাদ এবং দলিলমূলে প্রাপ্ত সম্পত্তির প্রকৃত মালিক সুজন শেখ (আজাদ)।
এ ঘটনাকে ভয়াবহ জালিয়াতি উল্লেখ করে সাবেক বালিয়াকান্দি সহকারী কমিশনার (ভূমি) এহসানুল হক শিপন বলেন, আজাদ ও আছাদ একই ব্যক্তি দাবি করে আনা ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়ন ও হলফনামার প্রেক্ষিতে এটি একই ব্যক্তির দুই নামে হওয়ার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য প্রতীয়মান হয়। কিন্তু জামালপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা আরাফাত হোসেন স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে, এখানে জালিয়াতি হচ্ছে। অতঃপর ভুক্তভোগীর আবেদন বিবেচনায় নিয়ে তার মা ও নিকটাত্মীয়ের জবানবন্দি ও অন্যান্য কাগজপত্র পরীক্ষা করে জালিয়াতি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আদালতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে হলফনামা সম্পন্ন করা একটি অপরাধ। এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্ত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন রাজবাড়ী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী মোঃ সুজন শেখ (আজাদ) বলেন, আমার নাম ও পরিচয় জালিয়াতি করে ভাই ভয়াবহ জালিয়াতি করেছে। আমার পৈতৃক ও নিজের কষ্টের টাকায় কেনা জমি গ্রাস করতে মরিয়া হয়ে গেছে। শুধু তাই নাই আমার নামে মিথ্যা মামলাও করা হয়েছে। আমি এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছিনা, নিরাপত্তীহনতায় ভুগছি।
এ বিষয়ে মোঃ আছাদ শেখ বলেন, আমরা দুই ভাই। মোঃ সুজন শেখ আমার ভাই। তবে ওর নাম আজাদ না, ওটা লাখ টাকা খরচ করে বানিয়েছে। আপনারা দুই ভাই তাহলে এক ভাইকে বাদ দিয়ে প্রত্যয়ন বা হফলনামায় কিভাবে দুই নামে একই ব্যক্তি করলেন? তিনি বলেন, আমার জমি জায়গা নিয়ে ঝামেলা আছে, ছ স্থলে জ দিয়ে আমার জমি নিয়ে নিছে। আদালতে মামলাও করেছি।
জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান খাইরুল ইসলাম বলেন, ভুল বুঝিয়ে এ জালিয়াতি করেছে আছাদ শেখ। বিষয়টি জানতে পেরে প্রত্যায়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।