রাজবাড়ী সাব ডিভিশনে ১০৩ অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ৮ মাসে ৬৮ জনের মৃত্যু

লেখক:
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

রুবেলুর রহমান : রাজবাড়ী সাব ডিভিশন (এরিয়া) রেলপথের বেশির ভাগ লেভেলক্রসিংই অরক্ষিত। ১৫৪ টি লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ৫১ টিতে রয়েছে বেড়িয়ারসহ গেটম্যান। অরক্ষিত রয়েছে ১০৩ টি, যেখানে নাই কোন গেটম্যান বা বেড়িয়ার। ফলে লেভেলক্রসিং ও রেলপথে প্রতিনিয়তই ঘটছে দূর্ঘটনা এবং বাড়ছে প্রাণহানি।
চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে আগষ্ট পর্যন্ত ৮ মাসে রাজবাড়ী এরিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়াসহ দূর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৬৮ জনের। দূর্ঘটনারোধে অবৈধ লেভেলক্রসিং বন্ধ করা সহ প্রতিটি লেভেলক্রসিংয়ে বেড়িয়ার ও গেটম্যানের দাবি স্থানীয়দের।
এদিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাট, পোরাদহ রেলপথে কালুখালীর কালিকাপুর রেলব্রীজ যেন এক মৃত্যু ফাঁদ। ছাদে ভ্রমণ করে এই স্থানে আসলেই মৃত্যু নিশ্চিত। চলতি বছর এ ব্রীজে প্রায় ৩-৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রাজবাড়ী সাব ডিভিশন এরিয়া (গোয়ালন্দ ঘাট-পাংশার মাছপাড়া এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গা জংশন-গোপালগঞ্জের গোবড়া) অংশে বৈধ ও অবৈধ মিলে লেভেলক্রসিং গেট রয়েছে মোট ১৫৪ টি। যার মধ্যে বৈধ ৬৭ টি এবং অবৈধ রয়েছে ৮৭ টি। এগুলো স্থানীয়রা তাদের চলাচলের সুবিধার্থে বিনা অনুমোতিতে তৈরি করেছে। এরমধ্যে ৫১ টিতে বেড়িয়ারসহ গেটম্যান থাকলেও ১০৩ টি রয়েছে সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
প্রতিদিন রাজবাড়ী হয়ে ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, গোয়ালন্দ ঘাট, পোড়াদহ রুটে একাধিকবার চলাচল করছে সুন্দরবন, বেনাপোল, মধুমতি ও টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস এবং নকশিকাথা, গোয়ালন্দ ঘাট-পোড়াদাহ শাটল ও রাজবাড়ী-ভাটিয়াপাড়া রাজবাড়ী মেইল ট্রেন। ফলে এসব এলাকায় রেলপথ থাকার সুবাধে রেলপথের বিভিন্ন অংশের উপর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বৈধ ও অবৈধ অসংখ্য লেভেলক্রসিং (সড়ক পথ)। যার কারণে লেভেলক্রসিং সহ রেলপথের বিভিন্ন স্থানে সামান্য অসাবধনতাসহ নানা কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোট বড় দূর্ঘটনা।
আকাশ মাহমুদ বলেন, রাজবাড়ীকে মূলত বলা হয় রেলের শহর। জেলার ৫ উপজেলার মধ্যে দিয়েই রয়েছে কমবেশি রেললাইন। এই রেললাইনের অনেকস্থানে রয়েছে অরক্ষিত লেভেলক্রসিং, যেখানে নাই কোন গেটম্যান বা বেরিয়ার। সম্প্রতি রাজবাড়ীতে ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানি সংখ্যা বেড়েছে। দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপ আশা করছি।
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারাবি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজবাড়ীতে ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। রাজবাড়ী থেকে পাংশা দিকে আসতে কালিকাপুর রেল ব্রীজটা একদমই নিচু। ট্রেনের ছাদ থেকে ব্রীজের গার্ডারে উচ্চতা এক হাতেরও কম হবে। ইচ্ছাকৃত বা ভুলবশত হোক কেউ যদি ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করে এই স্থানে আসে তাহলে মৃত্যু অনেকটাই নিশ্চিত। চলতি বছরে এইস্থানে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। কালুখালী এবং পাংশা স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্তে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে ট্রেনের ছাদে কাউকে ভ্রমণ না করতে দেয়া। তাহলে এখানে আর দুর্ঘটনা ঘটবে না।
সৈকত শতদল নামে আরেক ব্যাক্তি বলেন, কালিকাপুর রেল ব্রিজ একটি মৃত্যু ফাঁদ। ট্রেনের ছাদ থেকে ব্রীজের উচ্চতা খুব কম। যে কারণে কেউ ট্রেনের ছাদে উঠে এখানে আসলে মৃত্যু নিশ্চিত । এখানে আহতের চেয়ে নিহত সংখ্যায় বেশি হবে। কোন কোন মাসে এখানে এক বা একাধিক ঘটনাও ঘটেছে। বর্তমানে রাজবাড়ীর উপর দিয়ে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রেন চলাচল বেড়েছে। ফলে অনিয়ন্ত্রিত লেভেলক্রসিং এবং রেলপথে এই দুর্ঘটনাগুলো বেড়েছে। আমরা চাই এই ব্রীজের সমস্যা সমাধান করা সহ অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ে লোকবল নিয়োগ বা অবৈধ লেভেলক্রসিং বন্ধ করা হোক।
রতন মাহমুদ বলেন, রাজবাড়ীতে প্রায় শতাধিক অরক্ষিত লেভেলক্রসিং রয়েছে। নানা কারণে এসব স্থানেই ঘটছে দুর্ঘটনা। অরক্ষিত লেভেলক্রসিং গুলোতে জনবল নিয়োগ দেয়া হলে দূর্ঘটনা কমবে বলে মনে করছি।
সহকারী লোকো মাস্টার (ট্রেন চালক) এস এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ট্রেন চলাচলের সময় সাধারনতো সুনিদ্দিষ্ঠ কারণ ছাড়া পরিবর্তন হয় না। কোন এলাকা দিয়ে কখন কোন ট্রেন যায় তা প্রায় সবারই জানা। কিন্তু মানুষ এসব খেয়াল করে না এবং স্মরণও রাখে না। অমনোযোগী হয়ে হেসে খেলে রেল লাইন পার হওয়ার চেষ্টা করে । কোন কোন সময় ট্রেনের সাথে তারা প্রতিযোগিতা করে । এমন সময় মানুষ গুলো সামনে এসে পড়ে, যখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয় না । অন্যমানস্ক থাকার কারণেই দূর্ঘটনা গুলো ঘটছে।
রাজবাড়ী রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার তন্ময় কুমার দত্ত বলেন, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কোন যাত্রী যেন ছাদে ভ্রমণ না করতে পারে সেক্ষেত্রে স্টেশনে জিআরপি সদস্য এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য কঠোর প্রদক্ষেপ করে। এছাড়া রেল লাইন তো আসলে সংরক্ষিত এরিয়া। যার যার অবস্থান থেকে যদি সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় তাহলে দুর্ঘটনা অনেকাংশ রোধ করা সম্ভব হবে। সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে স্টেশনে ট্রেন আসার পূর্বে মাইকিং এর মাধমে যাত্রীদের মনযোগ আকর্ষন করা হয়। এবং ছাদে ভ্রমণ না করতে অনুরোধ জানানো হয়।
রাজবাড়ী রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, রাজবাড়ী এড়িয়ায় ১৫৪ টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। এরমধ্যে বেড়িয়ারসহ গেটম্যান আছে ৫১টিতে এবং ১০৩ টিতে নাই কোন মানুষ ও বেড়িয়ার। এই অংশে ৮৭ টি রয়েছে অবৈধ লেভেলক্রসিং। যা স্থানীয়রা তাদের সুবিধার্থে তৈরি করেছে। নিয়মতি রেল দিয়ে এগুলো বন্ধ করা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে কেউ না কেউ আবারও খুলে ফেলে। এ নিয়ে আমরা মামলাও করেছি। দূর্ঘটনা শুধু লেভেলক্রসিংয়ে হয় না, রেলপথের বিভিন্নস্থানে অসাবধানতাবশত বা অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে এসে কাটা পড়ে। কালিকাপুর রেলব্রীজ ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা। এটার উচ্চতা ১৪ ফুুট ৬ ইঞ্চি। ভবিষৎতে এটার উচ্চতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।