
সোহেল রানা : বাজারের ৩০ হাজার টাকা মূল্যের সৌরবাতি ৬০ হাজার টাকা দেখিয়ে রাজবাড়ীতে সাড়ে ৩৭ কোটি টাকার সড়ক আলোকরণ প্রকল্পে ১৮ কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। আর মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই বাতিগুলো অচল হয়ে অন্ধকারে পড়েছে। আলোকবাতির নিচে এখন অন্ধকার। আবার বর্তমান সরকার এ প্রকল্পের প্রতি অধিকগুরুত্ব দিয়েছেন। তবে স্থানীয়দের দাবী ভালো মানের প্যানেল স্থাপন না করলে থমকে যাবে আবারও।
জানাগেছে, রাজবাড়ী জেলার ৫টি উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা-কাবিটা) ও গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সৌরবাতি স্থাপন করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়। জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ৩৭ হাজার ১২ টাকা ব্যয়ে প্রায় ৬ হাজার ৮০০টি সৌরবাতি স্থাপন করা হয়। সৌরবাতি বিকলের কোন তথ্য নেই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে। চার অর্থবছরে রাজবাড়ী সদর উপজেলায় ১১ কোটি ৮৫ লাখ ৭১ হাজার ৭৩০ টাকা ব্যয়ে ২ হাজার ১৫৫টি সৌরবাতি স্থাপন করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ কোটি ৭ লাখ ২৩ হাজার ২৩২ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ কোটি ২৯ লাখ ২৬ হাজার ৮৮ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ কোটি ৮৩ লাখ ৯৯ হাজার ৬৮৩ টাকা ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ কোটি ৬৫ লাখ ২২ হাজার ৭২৭ টাকা ব্যয় করা হয়। পাংশা উপজেলায় ৭ কোটি ৭১ লাখ ৪৯ হাজার ২১৭ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৪০০টি, গোয়ালন্দ উপজেলায় ৭ কোটি ১১ লাখ ৩০ হাজার ৮৯৩ টাকা ব্যয়ে মোট ১ হাজার ২৯৩টি, কালুখালী উপজেলায় ৫ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৩০৮ টাকা ব্যয়ে ১৯১টি এবং বালিয়াকান্দি উপজেলায় ৫ কোটি ৫৮ লাখ ৩৪ হাজার ৮৬৪ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ১৫টি সৌরবাতি স্থাপন করা হয়। প্রতিটি সৌরবাতির জন্য ব্যয় হয় ৫৫ থেকে-৬০ হাজার টাকা।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, রাজবাড়ী জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক, মোড়, হাট-বাজার, কবরস্থান, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ রাতের বেলায় আলোকিত করতে সৌরবাতি স্থাপন করা হয়। এ বাতির কারণে গ্রামকে তখন শহর মনে হতো। কয়েক বছর না যেতেই এখন চিত্র ভিন্ন। ফিরে এসেছে সেই ভুতুরে পরিবেশ। আলোর স্থান এখন অন্ধকারে পরিণত হয়েছে। সঠিক তদারকির অভাব ও ব্যাপক লুটপাটের কারণে সরকারের আলোর প্রকল্প এখন অন্ধকারে পরিণত পড়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী আর সঠিক তদারকির অভাবে নষ্ট হয়েছে সড়কের অধিকাংশ সৌরবাতি।
নাম না প্রকাশের শর্তে একজন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বলেন, বাজারে যে দাম ছিল তার চেয়ে দ্বিগুন দামে সৌরবাতি ক্রয় করা হয়। আর নির্ধারিত কোম্পানী আর ঠিকাদারদের মাধ্যমে স্থাপন করার করার কারণে নিন্মমানের সৌরবাতি লাগানো হয়। শুধু মাত্র বাতি স্থাপিত হয়েছে কি না, তা দেখে বিল দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়। ওই বাতিগুলো ৩বছর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দেখভাল করার কথা ছিল। কিন্তু তারা তা করেনি। বাতি স্থাপনের পর থেকেই বিকল হওয়ার অভিযোগ আসতে থাকে। বাতি নষ্ট হলেও আমরা ঠিক করে দিতে পারবো না। এ কারণে ইতিমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদও শেষ হয়েছে। তাদের সাথে যোগাযোগ করেও কাজ হচ্ছে না।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্টিলের খুঁটির ওপর সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সোলারের নিচে খুঁটির সঙ্গে লাইট লাগানো। তার নিচে ব্যাটারি, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। সূর্যের আলো নিভে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতি জ্বলে ওঠে। আবার সকালে সূর্যের আলো উঠলে বাতিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিভে যায়। বাতি দেখে গ্রামের মানুষ খুবই খুশি হয়েছিলেন। গ্রামীণ ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি আসে। দ্রুত বাতিগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আলোর সুফল গ্রামের মানুষ এখন আর পায় না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো বাতিই তিন বছর জ্বলেনি। অনেক বাতি ৬ মাসের মধ্যে নষ্ট হয়েছে। কেউ সারাতে আসেনি। সরকার গ্রামের উন্নয়নে খরচ করল ঠিক কিন্তু তা স্থায়ী হলো না। বাতিগুলো স্থাপনের পর নিয়মিত বাতির তদারকির খুব দরকার ছিল। কিন্তু মেরামত নষ্ট হলেও সেটির পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়নি।
ব্যবসায়ী মনোয়ার হোসেন, এনামুল হক সহ কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, ৬০ হাজার টাকা মূল্যে ধরে যে সোলার লাইট স্থাপন করা হয়। ওই লাইটগুলোর বাজার মূল্যে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত ঠিকাদার দিয়ে কাজ করার কারণে অর্ধেক টাকাই লুটপাট হয়েছে। নিন্মমানের লাইট স্থাপন করায় কিছুদিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে।
কালুখালীর মাজবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী শরিফুল ইসলাম বলেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মোড়, হাটবাজার, স্কুল, মন্দির- মসজিদের সামনে সৌরবাতি স্থাপন করা হয়। বাতি বসানোর পর সরকারের এ কাজে এলাকাবাসী, ব্যবসায়ী সবাই খুশি হয়েছিল। বাতিগুলো যখন জ্বলতো তখন গ্রামকে শহরের মতো লাগতো। চুরি-ছিনতাই ছিল না। কিন্তু কিছুদিন পরই বাতির আলো বন্ধ হতে থাকল। এলাকাবাসী, ব্যবসায়ীরা বাতি সংস্কারের জন্য অনেকবার বলেছে। আমি নিজেও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে অনুরোধ করেছি। তারা সংস্কার করেনি। এখন বলে ওয়ারেন্টি শেষ। সব বাতির ব্যাটারি নষ্ট। সেটি বদলালে আবার বাতি আলো দেবে। মেরামত নেই, সরকারের টাকা নষ্ট হচ্ছে।
রাজবাড়ী খানখানাপুর বাজারের ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান বলেন, বাজারসহ এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান গুলোতে সৌরবাতি স্থাপন করা হয়। দিন যতই যাচ্ছে, সবই নষ্ট হয়ে অন্ধকারে পরিনত হচ্ছে। বেশির ভাগ লাইটই এখন আলো জ¦লে না।
বালিয়াকান্দি উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কোহিনুর জাহান বলেন, এ প্রকল্প অনেক আগের। নতুন করে এখনো আলোর প্রকল্প পায়নি। তবে পুরনো বাতি সচল করা যায় কিনা সে বিষয়ে মিটিংয়ে উপস্থাপন করা হবে।
বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দ মুরাদ ইসলাম বলেন, বাতিগুলো উপজেলা শহর ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশই এখন নষ্ট। তিন বছর পার হয়ে যাওয়ায় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস বাতিগুলো আর মেরামত বা সংস্কার করবে না। এ জন্য আমরা কোন প্রকল্প নিতে পারি কিনা সে বিষয়ে আলোচনা করবো।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিদ্যুতের উপর চাহিদা কমানোর জন্য আমরা গ্রাম পর্যায়সহ সরকারী বিভিন্ন স্থাপনায় সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এতে বিদ্যুতের চাহিদা হ্রাস পাবে। ব্যক্তি উদ্যোগে সোলার প্যানেল স্থাপনে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।
তিনি বলেন, আগে সড়ক বাতি গুলোতে নিন্মমানের প্যানেল স্থাপন করায় ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দ্রুতই নষ্ট হয়ে গেছে। ওই প্রকল্প গুলোর দুর্ণীতি খতিয়ে দেখা হবে।
