গোয়ালন্দে ডায়াগণস্টিক সেন্টারে টেস্ট বানিজ্য ও ভূল টেস্টের অভিযোগ

লেখক:
প্রকাশ: ৪ সপ্তাহ আগে

সিরাজুল ইসলাম : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টারে রোগ নির্ণয়ের নামে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো এবং ভূল রিপোর্টের অভিযোগ উঠেছে।
রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে গেলেই নানা ধরনের পরীক্ষার তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক, একের পর এক পরীক্ষা করানোর কারণে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে তাদের।
গোয়ালন্দ উপজেলার প্রধান সড়কগুলোর পাশে গড়ে ওঠা এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিতে আসা নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক রোগীর অভিযোগ, সাধারণ অসুস্থতা নিয়েও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে গেলে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে বলা হয়। এতে চিকিৎসকের ফি, ওষুধ ও পরীক্ষার খরচ মিলিয়ে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
লাকী আক্তার নামে এক রোগী পেটে ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে গোয়ালন্দের একটি ডায়াগণস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করান। পরীক্ষার পর দেওয়া প্রতিবেদনে তার কিডনিতে পানি জমেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসক তাকে ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন।
কয়েকদিন ওষুধ সেবনের পরও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় লাকী আক্তার ফরিদপুরের জায়েদ মেমোরিয়াল হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে পুনরায় আল্ট্রাসনোগ্রাফি করান। সেখানে করা পরীক্ষার প্রতিবেদনে তার গলব্লাডারে (পিত্তথলিতে) পাথর রয়েছে বলে জানানো হয়। পরে পুনরায় পরীক্ষা করানোর পর বিষয়টি নিশ্চিত হন বলে দাবি করেন তিনি।
লাকী আক্তারের অভিযোগ, গোয়ালন্দ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করা প্রথম পরীক্ষার রিপোর্ট সঠিক ছিল না। ওই রিপোর্টের কারণে তিনি ভুল চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি শারীরিক ও আর্থিকভাবে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চাপে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি একাধিক অতিরিক্ত পরীক্ষাও করতে বলা হয়। এছাড়া অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই প্যাথলজিস্ট টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। উন্নত চিকিৎসা সেবার নামে মানুষ ঠকানোর ব্যবসায় পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে রোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থাও কমে যাচ্ছে।
এছাড়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলোতে ৮০ টাকার ইসিজি রিপোর্ট করতে রোগীর কাছ থেকে নেওয়া হয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। সরকারি হাসপাতালের ২০০ টাকার সিবিসি ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলোতে ৬০০ টাকা নেওয়া হয়, ডায়াবেটিস পরীক্ষা হাসপাতালে ৬০ টাকা কিন্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ২০০ টাকা নিচ্ছে এছাড়া সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষা নীরিক্ষা ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলোর চাইতে ভালো হলেও তারা ঐ সমস্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলোতে পরীক্ষা নীরিক্ষার পরামর্শ দেন।
গোয়ালন্দ উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। এর মধ্যে নদীভাঙনকবলিত ও চরাঞ্চলের মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষি, দিনমজুরি ও ছোট ব্যবসাসহ বিভিন্ন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পেশার সঙ্গে যুক্ত। ফলে চিকিৎসার পেছনে বাড়তি ব্যয় তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
উপজেলায় সরকারি চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের তুলনায় সরকারি হাসপাতালের সেবার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিতে যান। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে টেস্ট বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা।
একজন রোগীর স্বজন বলেন, ডাক্তার দেখানোর জন্য ক্লিনিকে গেলে প্রথমেই কয়েকটি টেস্ট করতে বলা হয়। টেস্ট করাতে করাতেই অনেক টাকা চলে যায়। গরিব মানুষের জন্য এভাবে চিকিৎসা নেওয়া খুব কঠিন।
মজলিসপুর চর থেকে চিকিৎসা নিতে আস আলেয়া বেগম বলেন, হাসপাতালে ডাক্তার দেখাইছিলাম। ডাক্তার নাকি টেস্ট দিছে। পরে তারা বলল, হাসপাতালের টেস্ট নাকি ভালো না, বাইরে থেকে করাতে হবে। তাই বাইরে গিয়ে টেস্ট করাতে হইছে।
আরেক রোগী জানান, চিকিৎসকের ফি দেওয়ার পর একাধিক পরীক্ষা করানোর খরচ যোগ হওয়ায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার মতো অর্থও হাতে থাকে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কর্মরত এক চিকিৎসক বলেন, ক্লিনিক চলে টেস্টের টাকায়। টেস্ট না দিলে মালিকপক্ষ আমাদের চাপ দিতে থাকে। ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা কথা বলে আমরা টেস্ট দিতে বাধ্য হই।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মারুফ হাসান বলেন, চিকিৎসা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তাই রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কোনোভাবেই চিকিৎসাকে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝায় পরিণত করা উচিত নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে হাসপাতালেই বেশির ভাগ পরীক্ষা করা সম্ভব। হাসপাতালের পরীক্ষার মানও বাইরের তুলনায় ভালো।